বিভাগ 'গ' : দুটি অথবা তিনটি বাক্যে নীচের প্রশ্নগুলির উত্তর দাও (২ x ১৬ = ৩২)
৩.১ সতীদাহ প্রথা কী ছিল?
উত্তর: সতীদাহ প্রথা ছিল হিন্দু সমাজের এক নিষ্ঠুর কুপ্রথা, যেখানে স্বামীর মৃত্যুর পর তার বিধবা স্ত্রীকে স্বামীর চিতায় জীবন্ত পুড়িয়ে মারা হতো। রাজা রামমোহন রায়ের আন্দোলনের ফলে ১৮২৯ সালে এটি নিষিদ্ধ হয়।
৩.২ ব্রাহ্ম আন্দোলন বলতে কী বোঝ?
উত্তর: ঊনবিংশ শতকে রাজা রামমোহন রায় প্রতিষ্ঠিত ব্রাহ্মসমাজকে কেন্দ্র করে হিন্দু ধর্মের গোঁড়ামি, কুসংস্কার ও মূর্তিপূজার বিরুদ্ধে যে একেশ্বরবাদী ও সংস্কারমূলক আন্দোলন গড়ে ওঠে, তাকে ব্রাহ্ম আন্দোলন বলে।
৩.৩ ভারতে রচিত দুটি আত্মজীবনীর নাম লেখো।
উত্তর: ১) রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের 'জীবনস্মৃতি' এবং ২) সরলা দেবী চৌধুরানীর 'জীবনের ঝরাপাতা'।
৩.৪ স্থানীয় ইতিহাস চর্চা বলতে কী বোঝ?
উত্তর: কোনো নির্দিষ্ট ভৌগোলিক এলাকা বা অঞ্চলের জনজীবন, সংস্কৃতি, ঐতিহ্য ও ঘটনার ওপর ভিত্তি করে যে ইতিহাস রচিত হয়, তাকে স্থানীয় ইতিহাস চর্চা বলে। এটি জাতীয় ইতিহাসের ভিত্তি হিসেবে কাজ করে।
৩.৫ ঔপনিবেশিক অরণ্য আইন বলতে কী বোঝ?
উত্তর: ব্রিটিশ সরকার ভারতের বনজ সম্পদের ওপর নিজেদের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার জন্য ১৮৬৫ ও ১৮৭৮ সালে যে আইনগুলি প্রণয়ন করে, সেগুলিকে ঔপনিবেশিক অরণ্য আইন বলে। এর মাধ্যমে আদিবাসীদের অরণ্যের অধিকার কেড়ে নেওয়া হয়।
৩.৬ ঊনবিংশ শতাব্দীতে ভারতে উপজাতি বিদ্রোহের কারণগুলি কী ছিল?
উত্তর: উপজাতি বিদ্রোহের প্রধান কারণগুলি ছিল—অরণ্য আইনের মাধ্যমে তাদের অধিকার হরণ, মহাজন ও জমিদারদের শোষণ, অত্যাধিক রাজস্ব আদায় এবং তাদের নিজস্ব সংস্কৃতি ও ধর্মে ব্রিটিশদের হস্তক্ষেপ।
৩.৭ বঙ্গভাষা প্রকাশিকা সভার পরবর্তী সংগঠনগুলির ব্যর্থতার কারণ কী ছিল?
উত্তর: এই সংগঠনগুলি মূলত উচ্চবিত্ত ও জমিদার শ্রেণীর স্বার্থ রক্ষায় ব্যস্ত ছিল এবং সাধারণ মানুষের সাথে তাদের সংযোগ ছিল কম। এছাড়া তাদের রাজনৈতিক কর্মসূচি ছিল সীমিত ও আবেদন-নিবেদনমূলক, যা ব্রিটিশদের প্রভাবিত করতে ব্যর্থ হয়।
৩.৮ হিন্দু মেলা কী?
উত্তর: ১৮৬৭ সালে নবগোপাল মিত্র ও রাজনারায়ণ বসুর উদ্যোগে প্রতিষ্ঠিত একটি সংগঠন হলো হিন্দু মেলা। এর উদ্দেশ্য ছিল ভারতীয়দের মধ্যে স্বদেশপ্রেম জাগানো, দেশীয় শিল্পের প্রসার এবং শরীরচর্চার মাধ্যমে যুবসমাজকে শক্তিশালী করা।
৩.৯ বটতলা প্রকাশনা বলতে কী বোঝ?
উত্তর: উনিশ শতকে কলকাতার চিৎপুর ও শোভাবাজার অঞ্চলে গড়ে ওঠা ছাপাখানাগুলিকে কেন্দ্র করে যে সস্তা ও জনপ্রিয় বাংলা বই প্রকাশের ধারা তৈরি হয়েছিল, তাকে বটতলা প্রকাশনা বলা হয়। এটি সাধারণ মানুষের কাছে সাহিত্য পৌঁছে দিয়েছিল।
৩.১০ শ্রীরামপুর মিশন প্রেসের ভূমিকা কী ছিল?
উত্তর: ১৮০০ সালে প্রতিষ্ঠিত শ্রীরামপুর মিশন প্রেস বাংলা মুদ্রণ ও প্রকাশনার ইতিহাসে পথিকৃৎ ছিল। এখান থেকে বাইবেল, রামায়ণ, মহাভারত এবং পাঠ্যপুস্তক প্রকাশিত হওয়ায় বাংলা ভাষা ও শিক্ষার ব্যাপক প্রসার ঘটে।
৩.১১ একা আন্দোলন কী ছিল?
উত্তর: ১৯২১-২২ সালে যুক্তপ্রদেশে মাদারি পাসির নেতৃত্বে কৃষকদের ওপর জমিদারদের অত্যাধিক কর ও শোষণের বিরুদ্ধে যে আন্দোলন হয়, তা একা বা একতা আন্দোলন নামে পরিচিত। কৃষকরা ঐক্যবদ্ধ থাকার শপথ নিয়েছিল।
৩.১২ নিখিল ভারত ট্রেড ইউনিয়ন কংগ্রেস (AITUC) কবে প্রতিষ্ঠিত হয় এবং এর প্রথম সভাপতি কে ছিলেন?
উত্তর: নিখিল ভারত ট্রেড ইউনিয়ন কংগ্রেস (AITUC) ১৯২০ সালে প্রতিষ্ঠিত হয়। এর প্রথম সভাপতি ছিলেন লালা লাজপত রায়।
৩.১৩ মাতঙ্গিনী হাজরা কে ছিলেন?
উত্তর: মাতঙ্গিনী হাজরা ছিলেন একজন গান্ধিবাদী স্বাধীনতা সংগ্রামী। তিনি ১৯৪২-এর ভারত ছাড়ো আন্দোলনে মেদিনীপুরের তমলুকে মিছিলের নেতৃত্ব দেন এবং পুলিশের গুলিতে জাতীয় পতাকা হাতে শহিদ হন।
৩.১৪ ডঃ বি.আর. আম্বেদকর কে ছিলেন?
উত্তর: ডঃ বি.আর. আম্বেদকর ছিলেন ভারতীয় সংবিধানের রূপকার এবং দলিত সম্প্রদায়ের অবিসংবাদিত নেতা। তিনি অস্পৃশ্যতা দূরীকরণ এবং দলিতদের সামাজিক ও রাজনৈতিক অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য আজীবন সংগ্রাম করেছেন।
৩.১৫ সর্দার বল্লভভাই প্যাটেলকে কেন ভারতের লৌহমানব বলা হয়?
উত্তর: সর্দার বল্লভভাই প্যাটেল অত্যন্ত দৃঢ়তার সাথে ৫৬৫টি দেশীয় রাজ্যকে ভারতীয় ইউনিয়নের সঙ্গে যুক্ত করে ভারতের অখণ্ডতা রক্ষা করেছিলেন। তাঁর এই কঠোর ও আপসহীন নেতৃত্বের জন্য তাঁকে ভারতের লৌহমানব বলা হয়।
৩.১৬ ভিল বিদ্রোহের (১৮১৯) কারণ কী ছিল?
উত্তর: খানদেশ অঞ্চলে ব্রিটিশ শাসন প্রবর্তিত হলে ভিলদের ওপর রাজস্বের বোঝা চাপানো হয় এবং তাদের কৃষি ও অরণ্য অধিকার খর্ব করা হয়। এই শোষণ ও অত্যাচারের প্রতিবাদেই ১৮১৯ সালে ভিল বিদ্রোহ শুরু হয়।
বিভাগ 'ঘ' : সাত বা আটটি বাক্যে প্রতিটি উপবিভাগ থেকে অন্তত ১টি করে মোট ৬টি প্রশ্নের উত্তর দাও (৪ x ৬ = ২৪)
৪.১ স্বামী বিবেকানন্দের নব্যবেদান্তবাদের বৈশিষ্ট্যগুলি কী ছিল?
উত্তর: স্বামী বিবেকানন্দের নব্যবেদান্তের মূল কথা ছিল—জগতের সকল জীবই ব্রহ্মের অংশ, তাই 'জীব সেবাই শিব সেবা'। তিনি মোক্ষ লাভের জন্য সংসার ত্যাগ করে বনে যাওয়ার বিরোধী ছিলেন। তাঁর মতে, দরিদ্র, আর্ত ও পীড়িত মানুষের সেবার মাধ্যমেই ঈশ্বর লাভ সম্ভব। তিনি হিন্দু ধর্মের জাতিভেদ ও অস্পৃশ্যতার তীব্র নিন্দা করেন এবং সর্বধর্মসমন্বয়ের কথা বলেন। তাঁর ধর্ম ছিল মানবতাবাদী, যা মানুষকে শক্তি ও আত্মবিশ্বাস জোগায়। তিনি প্রাচ্যের আধ্যাত্মিকতার সাথে পাশ্চাত্যের কর্মোদ্যোগ ও সেবার আদর্শের মিলন ঘটাতে চেয়েছিলেন।
৪.২ বাংলার নবজাগরণের প্রকৃতি ও মূল্যায়ন আলোচনা করো।
উত্তর: ঊনবিংশ শতকের বাংলার নবজাগরণ ছিল মূলত শহরকেন্দ্রিক এবং উচ্চবিত্ত ও মধ্যবিত্ত শিক্ষিত সমাজের মধ্যে সীমাবদ্ধ। এর ফলে সাহিত্য, শিক্ষা, ধর্ম ও সমাজ সংস্কারের ক্ষেত্রে অভূতপূর্ব অগ্রগতি ঘটে। রাজা রামমোহন রায়, বিদ্যাসাগর প্রমুখের নেতৃত্বে কুসংস্কার দূরীকরণ ও যুক্তিবাদী চিন্তার প্রসার ঘটে। তবে অনিল শীল প্রমুখ ঐতিহাসিক একে 'এলিটিস্ট' বা অভিজাত আন্দোলন বলেছেন, কারণ গ্রাম বাংলার সাধারণ কৃষক ও মুসলিম সমাজের সাথে এর বিশেষ যোগ ছিল না। তবুও, এই নবজাগরণই ভারতের আধুনিকীকরণের ভিত্তি স্থাপন করেছিল এবং জাতীয়তাবাদী চেতনার উন্মেষ ঘটিয়েছিল।
৪.৩ ওয়াহাবি আন্দোলনের প্রকৃতি আলোচনা করো।
উত্তর: ওয়াহাবি আন্দোলন ছিল মূলত একটি ইসলামি সংস্কার আন্দোলন, যার লক্ষ্য ছিল ইসলাম ধর্মের শুদ্ধিকরণ। ভারতে সৈয়দ আহমেদ এবং বাংলায় তিতুমির এই আন্দোলনের নেতৃত্ব দেন। তবে কালক্রমে এটি ব্রিটিশ বিরোধী রাজনৈতিক ও কৃষক আন্দোলনে পরিণত হয়। তিতুমিরের নেতৃত্বে বারাসাত বিদ্রোহে দরিদ্র মুসলিম কৃষকরা জমিদার ও নীলকরদের শোষণের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ায়। অনেকে একে সাম্প্রদায়িক আন্দোলন বললেও, এর মূল চরিত্র ছিল সাম্রাজ্যবাদ ও সামন্ততন্ত্র বিরোধী। এটি ছিল শোষিত কৃষকদের বাঁচার লড়াই।
৪.৪ সাঁওতাল বিদ্রোহের কারণ ও বৈশিষ্ট্য বিশ্লেষণ করো।
উত্তর: ১৮৫৫ সালের সাঁওতাল বিদ্রোহের প্রধান কারণ ছিল—১) ব্রিটিশ রাজস্ব নীতির শোষণ, ২) বহিরাগত মহাজন বা দিকুদের ঋণের ফাঁদ ও প্রতারণা, ৩) রেল ঠিকাদার ও সরকারি কর্মচারীদের অত্যাচার। এই বিদ্রোহের বৈশিষ্ট্য হলো—এটি ছিল একটি ব্যাপক গণবিদ্রোহ যেখানে সাঁওতালদের সাথে কামার, কুমোর, তাঁতি ইত্যাদি নিম্নবর্গের মানুষও যোগ দিয়েছিল। বিদ্রোহীরা নিজস্ব শাসন প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে স্বাধীন সাঁওতাল রাজ্য ঘোষণা করেছিল। এটি ছিল ব্রিটিশ শাসনের বিরুদ্ধে আদিবাসীদের এক অসংগঠিত কিন্তু বীরত্বপূর্ণ সংগ্রাম।
৪.৫ ঔপনিবেশিক বাংলায় বিজ্ঞান ও কারিগরি শিক্ষার বিকাশ আলোচনা করো।
উত্তর: উনিশ শতকে বাংলায় বিজ্ঞান ও কারিগরি শিক্ষার উল্লেখযোগ্য বিকাশ ঘটে। মহেন্দ্রলাল সরকারের উদ্যোগে ১৮৭৬ সালে 'ইন্ডিয়ান অ্যাসোসিয়েশন ফর দ্য কাল্টিভেশন অফ সায়েন্স' প্রতিষ্ঠিত হয়, যা ছিল বিজ্ঞান গবেষণার প্রাণকেন্দ্র। প্রফুল্লচন্দ্র রায়, জগদীশচন্দ্র বসু প্রমুখ বিজ্ঞানীর অবদান ছিল অনস্বীকার্য। ১৯০৬ সালে স্বদেশী আন্দোলনের সময় তারকনাথ পালিতের উদ্যোগে 'বেঙ্গল টেকনিক্যাল ইনস্টিটিউট' প্রতিষ্ঠিত হয়, যা কারিগরি শিক্ষায় স্বনির্ভরতা আনে। এছাড়া কলকাতা বিজ্ঞান কলেজ (১৯১৪) বিজ্ঞান চর্চায় নতুন দিগন্ত উন্মোচন করে। এগুলি ছিল ঔপনিবেশিক শিক্ষার বিকল্প ও জাতীয় অগ্রগতির সোপান।
৪.৬ ঔপনিবেশিক বাংলায় ছাপাখানার বিকাশ কীভাবে শিক্ষা বিস্তারে সাহায্য করেছিল?
উত্তর: ছাপাখানার প্রবর্তন শিক্ষার বিস্তারে এক বিপ্লব এনেছিল। শ্রীরামপুর মিশন প্রেস ও অন্যান্য ছাপাখানা থেকে প্রচুর পরিমাণে পাঠ্যপুস্তক, সাহিত্য ও ধর্মীয় গ্রন্থ প্রকাশিত হওয়ায় বই সস্তা ও সহজলভ্য হয়। ক্যালকাটা স্কুল বুক সোসাইটি হাজার হাজার বই ছাপিয়ে স্কুলে স্কুলে পৌঁছে দেয়। বিদ্যাসাগরের 'বর্ণপরিচয়'-এর মতো বই গণশিক্ষার প্রসারে সাহায্য করে। এর ফলে জ্ঞান আর মুষ্টিমেয় মানুষের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকেনি, সাধারণ মানুষের কাছেও শিক্ষা পৌঁছাতে শুরু করে এবং নতুন বিদ্যালয় স্থাপনের পথ সুগম হয়।
৪.৭ বঙ্গভঙ্গ বিরোধী আন্দোলনে নারীদের ভূমিকা বিশ্লেষণ করো।
উত্তর: ১৯০৫ সালের বঙ্গভঙ্গ বিরোধী আন্দোলনে বাংলার নারীরা এক অভূতপূর্ব ভূমিকা পালন করে। রামেন্দ্রসুন্দর ত্রিবেদীর আহ্বানে তারা 'অরন্ধন' ব্রত পালন করে এবং রবীন্দ্রনাথের রাখি বন্ধন উৎসবে যোগ দেয়। সরলা দেবী চৌধুরানীর 'লক্ষ্মীর ভান্ডার' স্বদেশী পণ্য প্রচারে সাহায্য করে। নারীরা বিদেশি পণ্য, বিশেষ করে বিদেশি কাপড় ও চুড়ি বর্জন করে এবং চরকায় সুতো কাটতে শুরু করে। লীলাবতী মিত্র, হেমাঙ্গিনী দাস প্রমুখ নেত্রীরা নারীদের সংগঠিত করেন। এই আন্দোলন নারীদের ঘরের বাইরে এনে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে যুক্ত করেছিল।
৪.৮ বিংশ শতকে ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামে নারীদের ভূমিকা আলোচনা করো।
উত্তর: বিংশ শতকে ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামে নারীদের অংশগ্রহণ ছিল ব্যাপক ও বৈচিত্র্যময়। অসহযোগ, আইন অমান্য এবং ভারত ছাড়ো আন্দোলনে সরোজিনী নাইডু, বাসন্তী দেবী, ঊর্মিলা দেবী, মাতঙ্গিনী হাজরা প্রমুখ নারীরা নেতৃত্ব দেন। তাঁরা পিকেটিং, আইন অমান্য ও কারাবরণ করেন। সশস্ত্র বিপ্লবী আন্দোলনেও নারীরা পিছিয়ে ছিলেন না। প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদার, কল্পনা দত্ত, বীণা দাস, শান্তি-সুনীতি প্রমুখের বীরত্বপূর্ণ কাজ ব্রিটিশ সরকারকে কাঁপিয়ে দিয়েছিল। নারীদের এই আত্মত্যাগ ও অংশগ্রহণ স্বাধীনতা সংগ্রামকে এক গণআন্দোলনের রূপ দিয়েছিল।
বিভাগ 'ঙ' : পনেরো বা ষোলোটি বাক্যে যে কোনো ১টি প্রশ্নের উত্তর দাও (৮ x ১ = ৮)
৫.১ সমাজ সংস্কারক ও শিক্ষা সংস্কারক হিসেবে ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের অবদান মূল্যায়ন করো।
উত্তর: সমাজ সংস্কারক বিদ্যাসাগর: বিদ্যাসাগরের সমাজ সংস্কারের প্রধান কীর্তি হলো বিধবা বিবাহ প্রবর্তন। তিনি শাস্ত্র মন্থন করে প্রমাণ করেন যে বিধবা বিবাহ শাস্ত্রসম্মত। তাঁর নিরলস প্রচেষ্টায় ১৮৫৬ সালে বিধবা বিবাহ আইন পাস হয় এবং তিনি নিজের ছেলের সাথে এক বিধবার বিয়ে দিয়ে দৃষ্টান্ত স্থাপন করেন। এছাড়াও তিনি বহুবিবাহ, বাল্যবিবাহ এবং কৌলীন্য প্রথার বিরুদ্ধে তীব্র আন্দোলন গড়ে তোলেন।
শিক্ষা সংস্কারক বিদ্যাসাগর: শিক্ষা বিস্তারে, বিশেষত নারীশিক্ষায় তাঁর অবদান অবিস্মরণীয়। তিনি বেথুন স্কুল প্রতিষ্ঠায় সাহায্য করেন এবং বাংলার বিভিন্ন জেলায় ৩৫টি বালিকা বিদ্যালয় স্থাপন করেন। তিনি সংস্কৃত কলেজের দ্বার অব্রাহ্মণদের জন্য উন্মুক্ত করে দেন এবং আধুনিক পাঠ্যক্রম চালু করেন। তাঁর রচিত 'বর্ণপরিচয়', 'কথামালা', 'বোধোদয়' ইত্যাদি বই বাংলা শিশুশিক্ষার ভিত্তি স্থাপন করে। তিনি মেট্রোপলিটন ইনস্টিটিউশন প্রতিষ্ঠা করে উচ্চশিক্ষার পথ সুগম করেন। বিদ্যাসাগর ছিলেন প্রকৃত অর্থেই 'বিদ্যার সাগর' এবং করুণার সিন্ধু, যিনি আধুনিক বাংলার রূপকার।
৫.২ ১৮৫৭ সালের বিদ্রোহের কারণ ও বৈশিষ্ট্য আলোচনা করো।
উত্তর: বিদ্রোহের কারণ: ১) রাজনৈতিক: ডালহৌসির স্বত্ববিলোপ নীতির ফলে ঝাঁসি, সাতারা, নাগপুর প্রভৃতি রাজ্য গ্রাস করা হয়, যা দেশীয় রাজাদের ক্ষুব্ধ করে। ২) অর্থনৈতিক: ব্রিটিশদের শোষণ, ভূমি রাজস্ব নীতি এবং দেশীয় শিল্পের ধ্বংসসাধন কৃষকদের সর্বস্বান্ত করে। ৩) সামাজিক ও ধর্মীয়: সতীদাহ রদ, বিধবা বিবাহ আইন এবং খ্রিস্টান মিশনারিদের ধর্মান্তরকরণ ভারতীয়দের ধর্মে আঘাত হানে। ৪) সামরিক: সিপাহিদের কম বেতন, পদোন্নতিতে বাধা এবং এনফিল্ড রাইফেলের কার্তুজে গরু ও শুকরের চর্বি ব্যবহারের গুজব বিদ্রোহের আশু কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
বৈশিষ্ট্য: ১) এটি শুরু হয়েছিল সিপাহি বিদ্রোহ হিসেবে, কিন্তু দ্রুত তা গণবিদ্রোহের রূপ নেয়। ২) হিন্দু-মুসলিম ঐক্য ছিল এই বিদ্রোহের এক প্রধান বৈশিষ্ট্য। ৩) বিদ্রোহীরা মুঘল সম্রাট বাহাদুর শাহকে ভারতের সম্রাট ঘোষণা করে বিদেশি শাসন উচ্ছেদের ডাক দেয়। ৪) অযোধ্যা ও উত্তর ভারতে এটি ব্যাপক আকার ধারণ করলেও দক্ষিণ ও পূর্ব ভারতে এর প্রভাব ছিল কম। ৫) শিক্ষিত মধ্যবিত্ত শ্রেণি এই বিদ্রোহ থেকে দূরে ছিল।
৫.৩ অসহযোগ আন্দোলনের সাথে যুক্ত কৃষক আন্দোলনগুলির বিবরণ দাও।
উত্তর: ১৯২০-২২ সালের অসহযোগ আন্দোলনের সময় ভারতের বিভিন্ন প্রান্তে কৃষক আন্দোলন তীব্র আকার ধারণ করে।
১) যুক্তপ্রদেশ (উত্তরপ্রদেশ): বাবা রামচন্দ্রের নেতৃত্বে অযোধ্যা কিষাণ সভা কৃষকদের সংগঠিত করে। তারা জমিদারদের বেগার খাটানো এবং অতিরিক্ত করের বিরুদ্ধে আন্দোলন করে। ১৯২১ সালে মাদারি পাসির নেতৃত্বে 'একা' আন্দোলন শুরু হয়, যেখানে কৃষকরা ঐক্যবদ্ধ থাকার শপথ নেয়।
২) বাংলা: মেদিনীপুরে বীরেন্দ্রনাথ শাসমলের নেতৃত্বে ইউনিয়ন বোর্ড কর-বিরোধী আন্দোলন সফল হয়। রাজশাহীতে সোমেশ্বর প্রসাদ চৌধুরী নীলকরদের বিরুদ্ধে কৃষকদের নেতৃত্ব দেন।
৩) রাজস্থান: বিজোলিয়ায় ভুপ সিং বা বিজয় সিং পথিকের নেতৃত্বে কৃষকরা কর না দেওয়ার আন্দোলন করে।
৪) কেরালা: মালাবার উপকূলে মোপলা কৃষকরা হিন্দু জমিদার ও ব্রিটিশ সরকারের বিরুদ্ধে সশস্ত্র বিদ্রোহ ঘোষণা করে, যা মোপলা বিদ্রোহ নামে পরিচিত।
৫) অন্ধ্রপ্রদেশ: আল্লুরি সীতারাম রাজুর নেতৃত্বে রম্পা উপজাতিরা ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে গেরিলা যুদ্ধ চালায়। এই কৃষক আন্দোলনগুলি অসহযোগ আন্দোলনকে এক গণচরিত্র দান করেছিল।