৪.১ ব-দ্বীপ কীভাবে সৃষ্টি হয়? অথবা, ক্রান্তীয় মৌসুমি জলবায়ুর তিনটি বৈশিষ্ট্য লেখো।
উত্তর: নদীর মোহনায় ব-দ্বীপ সৃষ্টির প্রক্রিয়া: নদী যখন মোহনায় এসে সাগরে মিলিত হয়, তখন নদীর স্রোতের বেগ একদম কমে যায়। ফলে নদীবাহিত পলি, বালি, কাদা মোহনায় সঞ্চিত হতে থাকে। ক্রমাগত সঞ্চয়ের ফলে সেখানে স্থলভাগের সৃষ্টি হয়, যা দেখতে অনেকটা গ্রিক অক্ষর ডেল্টা (Δ) বা বাংলা 'ব'-এর মতো হয়। একেই ব-দ্বীপ বলে। ব-দ্বীপ সৃষ্টির অনুকূল শর্তগুলি হলো: ১) মোহনায় নদীর স্রোত ধীর হতে হবে। ২) নদীতে প্রচুর পরিমাণে পলি থাকতে হবে। ৩) মোহনায় সমুদ্রের গভীরতা কম হতে হবে এবং সমুদ্র শান্ত হতে হবে।
অথবা, ক্রান্তীয় মৌসুমি জলবায়ুর বৈশিষ্ট্য: ১) ঋতু পরিবর্তন: এই জলবায়ুতে গ্রীষ্ম, বর্ষা, শরৎ ও শীত—এই চারটি ঋতুর সুস্পষ্ট পরিবর্তন দেখা যায়। ২) বিপরীতমুখী বায়ুপ্রবাহ: গ্রীষ্মকালে দক্ষিণ-পশ্চিম এবং শীতকালে উত্তর-পূর্ব দিক থেকে মৌসুমি বায়ু প্রবাহিত হয়। ৩) বৃষ্টিপাতের অসম বণ্টন: মোট বৃষ্টিপাতের প্রায় ৮০-৯০ ভাগ বর্ষাকালেই হয় এবং বৃষ্টিপাত অনিয়মিত ও অনিশ্চিত প্রকৃতির হয়।
৪.২ বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় 4R পদ্ধতি বলতে কী বোঝো? অথবা, বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় শিক্ষার্থীর ভূমিকা আলোচনা করো।
উত্তর: বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় 4R পদ্ধতি বলতে বোঝায়—Reduce, Reuse, Recycle এবং Refuse। ১) Reduce (হ্রাসকরণ): বর্জ্যের পরিমাণ কমানো, অর্থাৎ প্রয়োজনের অতিরিক্ত দ্রব্য ব্যবহার না করা। ২) Reuse (পুনর্ব্যবহার): একই জিনিস বারবার ব্যবহার করা, যেমন—কাঁচের বোতল ধুয়ে পুনরায় ব্যবহার করা। ৩) Recycle (পুনর্নবীকরণ): বর্জ্য পদার্থকে প্রক্রিয়াকরণের মাধ্যমে নতুন দ্রব্যে পরিণত করা, যেমন—পুরানো কাগজ থেকে নতুন কাগজ তৈরি। ৪) Refuse (প্রত্যাখ্যান): পরিবেশ দূষণকারী দ্রব্য (যেমন প্লাস্টিক) ব্যবহার করতে অস্বীকার করা। এই চারটি পদ্ধতির সম্মিলিত প্রয়োগে পরিবেশ দূষণ রোধ করা সম্ভব।
অথবা, বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় শিক্ষার্থীর ভূমিকা: ১) সচেতনতা বৃদ্ধি: শিক্ষার্থীরা নিজেরা সচেতন হওয়ার পাশাপাশি পরিবার ও প্রতিবেশীদের বর্জ্য ফেলার সঠিক নিয়ম জানাতে পারে। ২) বর্জ্য পৃথকীকরণ: বাড়িতে পচনশীল (সবজির খোসা) ও অপচনশীল (প্লাস্টিক) বর্জ্য আলাদা ডাস্টবিনে ফেলার অভ্যাস করতে পারে। ৩) 'না' বলা: প্লাস্টিক ক্যারিব্যাগ বা থার্মোকল ব্যবহারে তারা 'না' বলবে এবং অন্যদেরও নিরুৎসাহিত করবে। ৪) বিদ্যালয় পরিষ্কার রাখা: শ্রেণিকক্ষ ও বিদ্যালয় প্রাঙ্গণ পরিষ্কার রেখে তারা নির্মল পরিবেশ গড়ে তুলতে সাহায্য করতে পারে।
৪.৩ সবুজ বিপ্লবের দুটি সুফল ও দুটি কুফল লেখো। অথবা, মৃত্তিকা ক্ষয়ের কারণগুলি আলোচনা করো।
উত্তর: সবুজ বিপ্লবের সুফল: ১) শস্য উৎপাদন বৃদ্ধি: উচ্চফলনশীল বীজ ও সার ব্যবহারের ফলে গম ও ধান উৎপাদন অভূতপূর্ব হারে বৃদ্ধি পায়, ভারত খাদ্যে স্বনির্ভর হয়। ২) কৃষকের আয় বৃদ্ধি: উৎপাদন বাড়ায় কৃষকদের অর্থনৈতিক অবস্থার উন্নতি ঘটে।
কুফল: ১) আঞ্চলিক বৈষম্য: সবুজ বিপ্লব মূলত পাঞ্জাব, হরিয়ানা ও পশ্চিম উত্তরপ্রদেশে সীমাবদ্ধ ছিল, ফলে ভারতের অন্যান্য অংশের কৃষকরা এর সুফল পায়নি। ২) মৃত্তিকার উর্বরতা হ্রাস: অতিরিক্ত রাসায়নিক সার ও কীটনাশক ব্যবহারের ফলে জমির স্বাভাবিক উর্বরতা শক্তি ও জলধারণ ক্ষমতা কমে গেছে।
অথবা, মৃত্তিকা ক্ষয়ের কারণ: ১) বৃক্ষচ্ছেদন: গাছের শিকড় মাটি আঁকড়ে ধরে রাখে। নির্বিচারে গাছ কাটার ফলে মাটি আলগা হয়ে ক্ষয়ে যায়। ২) অবৈজ্ঞানিক চাষবাস: পাহাড়ি ঢালে জুম চাষ বা ধাপ না কেটে চাষ করলে বৃষ্টির জলে মাটি ধুয়ে যায়। ৩) অতিরিক্ত পশুচারণ: তৃণভূমি নষ্ট হলে মাটির ওপরের স্তর উন্মুক্ত হয়ে ক্ষয়ে যায়। ৪) বৃষ্টিপাত ও বায়ুপ্রবাহ: প্রবল বৃষ্টিতে মাটির উপরের স্তর ধুয়ে যায় এবং মরু অঞ্চলে প্রবল বাতাসে বালি উড়ে গিয়ে মাটি ক্ষয় হয়।
৪.৪ উপগ্রহচিত্রের গুরুত্ব ও ব্যবহার লেখো। অথবা, ভূসমলয় উপগ্রহ ও সূর্যসমলয় উপগ্রহের মধ্যে তিনটি পার্থক্য লেখো।
উত্তর: উপগ্রহচিত্রের গুরুত্ব ও ব্যবহার: ১) আবহাওয়া পূর্বাভাস: মেঘের অবস্থান, ঘূর্ণিঝড়ের গতিপথ ও আবহাওয়া সংক্রান্ত তথ্য নির্ভুলভাবে জানা যায়। ২) সম্পদ আহরণ: বনভূমি, খনিজ সম্পদ ও জলসম্পদের অবস্থান নির্ণয়ে এটি ব্যবহৃত হয়। ৩) মানচিত্র তৈরি: দুর্গম অঞ্চলের মানচিত্র তৈরিতে এবং শহরের পরিকল্পনা ও রাস্তাঘাট নির্মাণে উপগ্রহচিত্র অপরিহার্য। ৪) সামরিক কাজ: দেশের নিরাপত্তা ও নজরদারিতে এবং শত্রুসৈন্যের অবস্থান জানতে এটি ব্যবহৃত হয়।
অথবা, পার্থক্য: ১) আবর্তন: ভূসমলয় উপগ্রহ পৃথিবীর আবর্তনের গতির সাথে সামঞ্জস্য রেখে ঘোরে (পশ্চিম থেকে পূর্বে), কিন্তু সূর্যসমলয় উপগ্রহ উত্তর থেকে দক্ষিণে মেরু বরাবর ঘোরে। ২) উচ্চতা: ভূসমলয় উপগ্রহ অনেক বেশি উচ্চতায় (প্রায় ৩৬,০০০ কিমি) থাকে, সূর্যসমলয় উপগ্রহ কম উচ্চতায় (৭০০-৯০০ কিমি) থাকে। ৩) ব্যবহার: ভূসমলয় মূলত যোগাযোগ ব্যবস্থা ও আবহাওয়ার কাজে লাগে, আর সূর্যসমলয় সম্পদ সমীক্ষা ও নজরদারিতে ব্যবহৃত হয়।
বিভাগ 'ঙ'
৫.১ নিম্নলিখিত প্রশ্নগুলির উত্তর দাও (৫ x ২ = ১০)
৫.১.১ নদীর ক্ষয়কার্যের ফলে গঠিত ভূমিরূপগুলি আলোচনা করো।
উত্তর: নদীর উচ্চগতি বা পার্বত্য প্রবাহে প্রবল স্রোত এবং শিলাখণ্ডের আঘাতে নদী মূলত ক্ষয়কার্য করে। এর ফলে গঠিত প্রধান ভূমিরূপগুলি হলো:
১) 'I' ও 'V' আকৃতির উপত্যকা: নদীর প্রবল নিম্নক্ষয়ের ফলে উপত্যকা খুব গভীর ও সংকীর্ণ হয়, যা ইংরেজি 'I' আকৃতির মতো দেখতে হয়, একে ক্যানিয়ন বলে (যেমন- গ্র্যান্ড ক্যানিয়ন)। আবার বৃষ্টিবহুল অঞ্চলে নিম্নক্ষয়ের সাথে সাথে পার্শ্বক্ষয় হলে উপত্যকা 'V' আকৃতির হয়, একে গিরিখাত বলে (যেমন- সিন্ধু নদের গিরিখাত)।
২) জলপ্রপাত: নদীপথে যদি কঠিন ও কোমল শিলা ওপর-নীচে বা আড়াআড়িভাবে অবস্থান করে, তবে কোমল শিলা দ্রুত ক্ষয়প্রাপ্ত হয় এবং কঠিন শিলা উঁচু হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে। তখন নদীর জল খাড়া ঢাল বেয়ে প্রবল বেগে নীচে পড়ে, একে জলপ্রপাত বলে। যেমন- যোগ জলপ্রপাত বা নায়েগ্রা জলপ্রপাত।
৩) প্রপাতকূপ (Plunge Pool): জলপ্রপাতের নীচে যেখানে জল পড়ে, সেখানে প্রবল আঘাতে গর্তের সৃষ্টি হয়, একে প্রপাতকূপ বলে।
৪) মন্থকূপ (Pot Hole): নদীর তলদেশে ঘূর্ণায়মান পাথরখণ্ডের আঘাতে যে ছোট ছোট গোলাকার গর্তের সৃষ্টি হয়, তাকে মন্থকূপ বলে। অসংখ্য মন্থকূপ পাশাপাশি থাকলে তাকে 'মন্থকূপ কলোনি' বলা হয়। এগুলি নদীর ক্ষয়কার্যের অন্যতম নিদর্শন।
৫.১.২ চিত্রসহ নিয়ত বায়ু প্রবাহের বিবরণ দাও।
উত্তর: যে বায়ু সারাবছর নির্দিষ্ট দিক থেকে নির্দিষ্ট দিকে প্রবাহিত হয়, তাকে নিয়ত বায়ু বলে। এটি তিন প্রকার: ১) আয়ন বায়ু: কর্কটীয় ও মকরীয় উচ্চচাপ বলয় থেকে নিরক্ষীয় নিম্নচাপ বলয়ের দিকে প্রবাহিত বায়ুকে আয়ন বায়ু বলে। উত্তর গোলার্ধে এটি উত্তর-পূর্ব আয়ন বায়ু এবং দক্ষিণ গোলার্ধে দক্ষিণ-পূর্ব আয়ন বায়ু নামে পরিচিত। এর প্রভাবে মহাদেশের পশ্চিমে মরুভূমি সৃষ্টি হয়। ২) পশ্চিমা বায়ু: কর্কটীয় ও মকরীয় উচ্চচাপ বলয় থেকে মেরুবৃত্ত প্রদেশীয় নিম্নচাপ বলয়ের দিকে প্রবাহিত বায়ুকে পশ্চিমা বায়ু বলে। উত্তর গোলার্ধে এটি দক্ষিণ-পশ্চিম এবং দক্ষিণ গোলার্ধে উত্তর-পশ্চিম দিক থেকে প্রবাহিত হয়। এর প্রভাবে মহাদেশের পশ্চিমে বৃষ্টিপাত হয়। ৩) মেরু বায়ু: দুই মেরুদেশীয় উচ্চচাপ বলয় থেকে মেরুবৃত্ত প্রদেশীয় নিম্নচাপ বলয়ের দিকে প্রবাহিত অতিশীতল বায়ুকে মেরু বায়ু বলে। এটি উত্তর গোলার্ধে উত্তর-পূর্ব এবং দক্ষিণ গোলার্ধে দক্ষিণ-পূর্ব দিক থেকে প্রবাহিত হয়। (চিত্রসহ বর্ণনায় পৃথিবীর চাপবলয় ও বায়ুপ্রবাহের দিক দেখাতে হবে)।
৫.১.৩ জেট বায়ুপ্রবাহের তিনটি বৈশিষ্ট্য লেখো। এই বায়ুর সঙ্গে মৌসুমি বায়ুর সম্পর্ক লেখো।
উত্তর: জেট বায়ুপ্রবাহের বৈশিষ্ট্য: ১) অবস্থান: এটি ট্রপোস্ফিয়ারের ঊর্ধ্বস্তরে (৯-১২ কিমি উচ্চতায়) পশ্চিম থেকে পূর্বে সংকীর্ণ পথে প্রবাহিত হয়। ২) গতিবেগ: এর গতিবেগ অত্যন্ত প্রবল, ঘন্টায় প্রায় ৩০০-৪০০ কিমি বা তারও বেশি হতে পারে। ৩) সর্পিল গতি: এটি আঁকাবাঁকা পথে বা সর্পিল গতিতে প্রবাহিত হয়।
মৌসুমি বায়ুর সঙ্গে সম্পর্ক: জেট বায়ু ভারতের মৌসুমি বায়ুকে নিয়ন্ত্রণ করে। গ্রীষ্মকালে তিব্বত মালভূমির ওপর সৃষ্ট 'পুবালি জেট' বায়ু দক্ষিণ-পশ্চিম মৌসুমি বায়ুকে ভারতে টেনে আনে, ফলে বর্ষাকাল শুরু হয়। আবার শীতকালে হিমালয়ের দক্ষিণে প্রবাহিত 'পশ্চিমী জেট' বায়ু উত্তর-পূর্ব মৌসুমি বায়ুকে সক্রিয় করে এবং ভূমধ্যসাগরীয় পশ্চিমী ঝঞ্ঝাকে ভারতে নিয়ে আসে। জেট বায়ুর অবস্থান ও প্রকৃতির ওপর ভারতের বৃষ্টিপাতের পরিমাণ ও সময় নির্ভর করে।
৫.১.৪ সমুদ্রস্রোত সৃষ্টির কারণগুলি আলোচনা করো।
উত্তর: সমুদ্রস্রোত সৃষ্টির প্রধান কারণগুলি হলো: ১) নিয়ত বায়ুপ্রবাহ: আয়ন বায়ু, পশ্চিমা বায়ু ও মেরু বায়ু সমুদ্রের জলরাশিকে নির্দিষ্ট পথে তাড়িত করে স্রোতের সৃষ্টি করে। এটিই প্রধান কারণ। ২) পৃথিবীর আবর্তন গতি: পৃথিবীর আবর্তনের ফলে সৃষ্ট কোরিওলিস বলের প্রভাবে সমুদ্রস্রোত উত্তর গোলার্ধে ডানদিকে এবং দক্ষিণ গোলার্ধে বামদিকে বেঁকে প্রবাহিত হয়। ৩) সমুদ্রজলের উষ্ণতার পার্থক্য: নিরক্ষীয় অঞ্চলের উষ্ণ ও হালকা জল বহিঃস্রোত রূপে মেরুর দিকে এবং মেরু অঞ্চলের শীতল ও ভারী জল অন্তঃস্রোত রূপে নিরক্ষরেখার দিকে প্রবাহিত হয়। ৪) লবণাক্ততার পার্থক্য: বেশি লবণাক্ত জল ভারী বলে নীচ দিয়ে এবং কম লবণাক্ত জল হালকা বলে ওপর দিয়ে প্রবাহিত হয়। ৫) উপকূলের আকৃতি: মহাদেশের উপকূলভাগে বাধা পেয়ে সমুদ্রস্রোতের দিক পরিবর্তিত হয় বা বিভক্ত হয়ে যায়।
৫.২ নিম্নলিখিত প্রশ্নগুলির উত্তর দাও (৫ x ২ = ১০)
৫.২.১ ভারতের পূর্ব ও পশ্চিম উপকূলীয় সমভূমির তুলনা করো।
উত্তর: ভারতের পূর্ব ও পশ্চিম উপকূলের পার্থক্য: ১) অবস্থান ও বিস্তার: পূর্ব উপকূল বঙ্গোপসাগর ও পূর্বঘাট পর্বতের মাঝে চওড়া (৮০-১০০ কিমি) সমভূমি, কিন্তু পশ্চিম উপকূল আরব সাগর ও পশ্চিমঘাট পর্বতের মাঝে সংকীর্ণ (১০-৮০ কিমি) সমভূমি। ২) ব-দ্বীপ: পূর্ব উপকূলের নদীগুলির (মহানদী, গোদাবরী, কৃষ্ণা, কাবেরী) মোহনায় বিশাল ব-দ্বীপ আছে, কিন্তু পশ্চিম উপকূলের নদীগুলিতে (নর্মদা, তাপ্তি) কোনো ব-দ্বীপ নেই। ৩) বালিয়াড়ি ও হ্রদ: পূর্ব উপকূলে বালিয়াড়ি ও লেগুন (যেমন চিল্কা) দেখা যায়, পশ্চিম উপকূলে লেগুন বা কয়াল (যেমন ভেম্বানাদ) এবং অসংখ্য ছোট ছোট খাড়ি দেখা যায়। ৪) বন্দর: পূর্ব উপকূলের সমুদ্র অগভীর হওয়ায় এখানে কৃত্রিম পোতাশ্রয়যুক্ত বন্দর বেশি, কিন্তু পশ্চিম উপকূলের সমুদ্র গভীর ও ভগ্ন হওয়ায় এখানে স্বাভাবিক পোতাশ্রয়যুক্ত বন্দর বেশি। ৫) বৃষ্টিপাত: পশ্চিম উপকূলে পূর্ব উপকূলের চেয়ে বেশি বৃষ্টিপাত হয়।
৫.২.২ চা-চাষের অনুকূল পরিবেশ সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা করো।
উত্তর: চা একপ্রকার বাগিচা ফসল। এর অনুকূল ভৌগোলিক পরিবেশগুলি হলো:
১) জলবায়ু: চা ক্রান্তীয় ও উপক্রান্তীয় অঞ্চলের ফসল। উষ্ণ ও আর্দ্র জলবায়ু প্রয়োজন। তাপমাত্রা: ২০°C-৩০°C তাপমাত্রা চা চাষের জন্য আদর্শ। বৃষ্টিপাত: প্রচুর বৃষ্টিপাত (১৫০-২৫০ সেমি) প্রয়োজন।
২) মৃত্তিকা: লৌহমিশ্রিত দোআঁশ মাটি এবং জৈব পদার্থ সমৃদ্ধ অম্লধর্মী মাটি চা চাষের পক্ষে উপযুক্ত।
৩) ভূমির প্রকৃতি: চা গাছের গোড়ায় জল জমলে শিকড় পচে যায়, তাই পাহাড়ের ঢালু জমি চা চাষের জন্য শ্রেষ্ঠ।
৪) ছায়া প্রদানকারী বৃক্ষ: প্রখর রোদ থেকে চা গাছকে বাঁচাতে বাগিচার মাঝে মাঝে ওক, সিলভার ওক প্রভৃতি বড় গাছ লাগানো হয়।
৫) শ্রমিক ও মূলধন: চা পাতা তোলার জন্য প্রচুর সুলভ ও দক্ষ শ্রমিকের প্রয়োজন হয়, বিশেষ করে মহিলা শ্রমিকরা এই কাজে দক্ষ। এছাড়া বাগান তৈরি, রক্ষণাবেক্ষণ ও প্রক্রিয়াকরণের জন্য প্রচুর মূলধনের প্রয়োজন হয়।
৫.২.৩ পূর্ব ভারতে লৌহ-ইস্পাত শিল্পের কেন্দ্রীভবনের কারণগুলি আলোচনা করো।
উত্তর: ভারতের দুর্গাপুর, জামশেদপুর, রৌরকেল্লা, বোকারো প্রভৃতি অঞ্চলে লৌহ-ইস্পাত শিল্পের একদেশীভবন বা কেন্দ্রীভবনের কারণগুলি হলো:
১) কাঁচামালের সহজলভ্যতা: ছোটনাগপুর মালভূমি অঞ্চল খনিজ সম্পদে সমৃদ্ধ। এখান থেকে আকরিক লোহা (সিংভূম, ময়ূরভঞ্জ), কয়লা (ঝরিয়া, রানিগঞ্জ), ম্যাঙ্গানিজ, চুনাপাথর ও ডলোমাইট সহজেই পাওয়া যায়।
২) জলের জোগান: দামোদর, সুবর্ণরেখা, খরকাই, মহানদী প্রভৃতি নদী ও ডিভিসি-র জলাধার থেকে শিল্পের প্রয়োজনীয় প্রচুর জল পাওয়া যায়।
৩) বিদ্যুৎ শক্তি: এই অঞ্চলে তাপবিদ্যুৎ (DVC, NTPC) ও জলবিদ্যুৎ কেন্দ্রের প্রাচুর্য থাকায় সস্তায় বিদ্যুৎ পাওয়া যায়।
৪) পরিবহন ব্যবস্থা: পূর্ব ও দক্ষিণ-পূর্ব রেলপথ এবং কলকাতা ও হলদিয়া বন্দরের নৈকট্য কাঁচামাল আমদানি ও পণ্য রপ্তানিতে সুবিধা করে দেয়।
৫) শ্রমিক ও বাজার: বিহার, ঝাড়খণ্ড, ওড়িশা ও পশ্চিমবঙ্গ থেকে সুলভ শ্রমিক পাওয়া যায় এবং কলকাতা ও পার্শ্ববর্তী শিল্পাঞ্চলে ইস্পাতের বিপুল চাহিদা বা বাজার রয়েছে।
৫.২.৪ ভারতের জলবায়ুর প্রধান নিয়ন্ত্রকগুলি আলোচনা করো।
উত্তর: ভারতের জলবায়ু বৈচিত্র্যময় এবং এর প্রধান নিয়ন্ত্রকগুলি হলো:
১) অক্ষাংশগত অবস্থান: কর্কটক্রান্তি রেখা ভারতের মাঝখান দিয়ে গেছে। তাই ভারতের উত্তরাংশ উপক্রান্তীয় এবং দক্ষিণাংশ ক্রান্তীয় জলবায়ুর অন্তর্গত।
২) হিমালয় পর্বতের অবস্থান: উত্তরে হিমালয় পর্বত থাকায় মধ্য এশিয়ার হাড়কাঁপানো শীতল বাতাস ভারতে প্রবেশ করতে পারে না, আবার জলীয় বাষ্পপূর্ণ মৌসুমি বায়ু হিমালয়ে বাধা পেয়ে প্রচুর বৃষ্টিপাত ঘটায়।
৩) মৌসুমি বায়ু: ভারতের জলবায়ু মূলত মৌসুমি বায়ুর দ্বারা নিয়ন্ত্রিত। এর আগমন ও প্রত্যাগমনের ওপর ভিত্তি করেই ঋতুচক্র আবর্তিত হয়।
৪) সমুদ্র থেকে দূরত্ব: সমুদ্রের কাছের স্থানগুলিতে (মুম্বাই, চেন্নাই) সমভাবাপন্ন জলবায়ু এবং সমুদ্র থেকে দূরের স্থানগুলিতে (দিল্লি, অমৃতসর) চরমভাবাপন্ন জলবায়ু দেখা যায়।
৫) উচ্চতা: উচ্চতা বাড়লে উষ্ণতা কমে, তাই সমভূমির তুলনায় পাহাড়ি অঞ্চল (দার্জিলিং, শিমলা) বেশি শীতল ও আরামদায়ক হয়। এছাড়াও ভূপ্রকৃতি, এল নিনো ও জেট বায়ু ভারতের জলবায়ুকে নিয়ন্ত্রণ করে।