বিভাগ 'ঙ' : ৫.১. যেকোনো দুটি প্রশ্নের উত্তর দাও এবং ৫.২. যেকোনো দুটি প্রশ্নের উত্তর দাও (৫ x ৪ = ২০)
৫.১ প্রাকৃতিক ভূগোল
৫.১.১) নদীর ক্ষয়কার্যের ফলে সৃষ্ট ৪টি (চার) ভূমিরূপ চিত্রসহ আলোচনা করো।
উত্তর: নদীর উচ্চগতি বা পার্বত্য প্রবাহে প্রবল স্রোতের কারণে নদী মূলত ক্ষয়কার্য করে। নদীর ক্ষয়কার্যের ফলে সৃষ্ট চারটি প্রধান ভূমিরূপ নিচে আলোচনা করা হলো:
১) 'I' ও 'V' আকৃতির উপত্যকা (গিিখাত ও ক্যানিয়ন): পার্বত্য অঞ্চলে নদীর নিম্নক্ষয় পার্শ্বক্ষয়ের চেয়ে অনেক বেশি হলে ইংরেজি 'I' অক্ষরের মতো গভীর গিরিখাত সৃষ্টি হয় (যেমন- সিন্ধু নদের গিরিখাত)। আবার বৃষ্টিবহুল অঞ্চলে নিম্নক্ষয়ের সাথে সাথে পার্শ্বক্ষয়ও হলে ইংরেজি 'V' আকৃতির উপত্যকা সৃষ্টি হয়। শুষ্ক অঞ্চলে গভীর ও সংকীর্ণ গিরিখাতকে ক্যানিয়ন বলে (যেমন- গ্র্যান্ড ক্যানিয়ন)।
২) জলপ্রপাত: নদীর গতিপথে কঠিন ও নরম শিলা পর্যায়ক্রমে আড়াআড়িভাবে অবস্থান করলে, নদীর জলস্রোত নরম শিলাকে বেশি ক্ষয় করে এবং কঠিন শিলা উঁচু হয়ে থাকে। ফলে নদীর জল হঠাৎ ওপর থেকে খাড়াভাবে নীচে পড়লে জলপ্রপাতের সৃষ্টি হয় (যেমন- যোগ জলপ্রপাত)।
৩) প্রপাত কূপ (Plunge Pool): জলপ্রপাতের জল যেখানে প্রবল বেগে নীচে আছড়ে পড়ে, সেখানে গর্তের সৃষ্টি হয়। এই গর্তগুলি ক্রমাগত বড় ও গভীর হয়ে হাঁড়ির মতো আকার ধারণ করলে তাকে প্রপাত কূপ বা প্লাঞ্জ পুল বলে।
৪) মন্থকূপ (Pothole): নদীর তলদেশে অবঘর্ষ প্রক্রিয়ায় সৃষ্টি হওয়া ছোট ছোট গোলাকার গর্তগুলিকে মন্থকূপ বলে। নদীর জলের ঘূর্ণি ও তার সাথে থাকা প্রস্তরখণ্ডের আঘাতে এই গর্তগুলির সৃষ্টি হয়। অসংখ্য মন্থকূপ একসঙ্গে থাকলে তাকে 'মন্থকূপ কলোনি' বলে।
৫.১.২) চিত্রসহ ঘূর্ণবাত ও প্রতীপ ঘূর্ণবাতের পাঁচটি পার্থক্য লেখো।
উত্তর: ঘূর্ণবাত ও প্রতীপ ঘূর্ণবাতের প্রধান পার্থক্যগুলি হলো:
১) বায়ুচাপের প্রকৃতি: ঘূর্ণবাতের কেন্দ্রে নিম্নচাপ এবং বাইরে উচ্চচাপ বিরাজ করে। কিন্তু প্রতীপ ঘূর্ণবাতের কেন্দ্রে উচ্চচাপ এবং বাইরে নিম্নচাপ বিরাজ করে।
২) বায়ু প্রবাহের দিক: ঘূর্ণবাতে বায়ু উত্তর গোলার্ধে ঘড়ির কাঁটার বিপরীত দিকে এবং দক্ষিণ গোলার্ধে ঘড়ির কাঁটার দিকে কেন্দ্রে প্রবেশ করে। বিপরীতক্রমে, প্রতীপ ঘূর্ণবাতে বায়ু উত্তর গোলার্ধে ঘড়ির কাঁটার দিকে এবং দক্ষিণ গোলার্ধে বিপরীত দিকে কেন্দ্র থেকে বাইরের দিকে বেরিয়ে যায়।
৩) আবহাওয়ার প্রকৃতি: ঘূর্ণবাতের ফলে আকাশ মেঘাচ্ছন্ন থাকে, ঝড় ও প্রচুর বৃষ্টিপাত হয়। এটি দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়া নির্দেশ করে। অন্যদিকে, প্রতীপ ঘূর্ণবাতে আকাশ মেঘমুক্ত থাকে এবং আবহাওয়া শান্ত ও মনোরম হয়।
৪) স্থায়িত্ব ও বিস্তার: ঘূর্ণবাতের স্থায়িত্ব কম কিন্তু এটি খুব দ্রুত স্থান পরিবর্তন করে এবং এর বিস্তার কম অঞ্চলের মধ্যে হয়। প্রতীপ ঘূর্ণবাত অনেক বেশি স্থান জুড়ে অবস্থান করে এবং এটি দীর্ঘস্থায়ী হয়।
৫) ধ্বংসক্ষমতা: ঘূর্ণবাত অত্যন্ত শক্তিশালী ও ধ্বংসাত্মক হয় (যেমন- আয়লা, আমফান)। প্রতীপ ঘূর্ণবাত ধ্বংসাত্মক নয়, এটি শান্ত আবহাওয়ার প্রতীক।
৫.১.৩) চিত্রসহ বৈপরীত্য উত্তাপের তিনটি কারণ ব্যাখ্যা করো।
উত্তর: সাধারণ নিয়মে উচ্চতা বৃদ্ধির সাথে সাথে উষ্ণতা হ্রাস পায়। কিন্তু বিশেষ কিছু অবস্থায় উচ্চতা বৃদ্ধির সাথে সাথে উষ্ণতা হ্রাস না পেয়ে বরং বৃদ্ধি পায়। এই ঘটনাকে বৈপরীত্য উত্তাপ (Inversion of Temperature) বলে। এর প্রধান তিনটি কারণ হলো:
১) দীর্ঘ শীতকালীন রাত্রি: শীতকালে রাত বড় হলে ভূপৃষ্ঠ তাপ বিকিরণ করে দ্রুত শীতল হয়ে পড়ে। ফলে ভূপৃষ্ঠ সংলগ্ন বায়ুস্তর উপরের বায়ুস্তরের চেয়ে বেশি শীতল ও ভারী হয়ে নীচে অবস্থান করে এবং উপরের বায়ুস্তর অপেক্ষাকৃত উষ্ণ থাকে। এর ফলে বৈপরীত্য উত্তাপ সৃষ্টি হয়।
২) মেঘমুক্ত আকাশ: আকাশ মেঘমুক্ত থাকলে ভূপৃষ্ঠ থেকে বিকিরিত তাপ কোনো বাধা না পেয়ে মহাশূন্যে ফিরে যায়। ফলে ভূপৃষ্ঠ ও সংলগ্ন বাতাস দ্রুত ঠান্ডা হয়, কিন্তু উপরের বাতাস উষ্ণ থাকে।
৩) শান্ত আবহাওয়া: বাতাস স্থির বা শান্ত থাকলে বিভিন্ন উষ্ণতার বায়ুস্তর একে অপরের সাথে মিশতে পারে না। ফলে নীচের শীতল বাতাস নীচে এবং উপরের উষ্ণ বাতাস উপরেই অবস্থান করে, যা বৈপরীত্য উত্তাপ ঘটাতে সাহায্য করে। পার্বত্য উপত্যকায় এই ঘটনা বেশি দেখা যায়।
৫.১.৪) চিত্রসহ জোয়ারভাটার শ্রেণিবিভাগ করো।
উত্তর: জোয়ারভাটাকে মূলত চারটি ভাগে ভাগ করা যায়:
১) মুখ্য জোয়ার (Primary Tide): পৃথিবীর যে অংশ চাঁদের ঠিক সামনে থাকে, সেখানে চাঁদের প্রবল আকর্ষণে জলরাশি ফুলে ওঠে এবং জোয়ারের সৃষ্টি হয়। একে মুখ্য জোয়ার বা প্রত্যক্ষ জোয়ার বলে।
২) গৌণ জোয়ার (Secondary Tide): পৃথিবীর যে স্থানে মুখ্য জোয়ার হয়, তার ঠিক প্রতিপাদ স্থানে (বিপরীত দিকে) চাঁদের আকর্ষণ কম থাকে এবং কেন্দ্রাতিগ বল বা বিকর্ষণ শক্তি বেশি কার্যকরী হয়। ফলে সেখানকার জলরাশি বাইরের দিকে ছিটকে গিয়ে ফুলে ওঠে এবং জোয়ার হয়। একে গৌণ বা পরোক্ষ জোয়ার বলে।
৩) ভরা কোটাল (Spring Tide): অমাবস্যা ও পূর্ণিমা তিথিতে পৃথিবী, চাঁদ ও সূর্য একই সরলরেখায় অবস্থান করলে (সিজিগি), চাঁদ ও সূর্যের মিলিত আকর্ষণে জোয়ারের প্রাবল্য খুব বেশি হয়। একে ভরা কোটাল বা তেজকটাল বলে।
৪) মরা কোটাল (Neap Tide): কৃষ্ণপক্ষ ও শুক্লপক্ষের অষ্টমী তিথিতে চাঁদ ও সূর্য পৃথিবীর সাথে সমকোণে (৯০° কোণে) অবস্থান করে। ফলে চাঁদ ও সূর্যের আকর্ষণ বল পরস্পর বিরোধী কাজ করায় জোয়ারের জল খুব বেশি ফোলে না। একে মরা কোটাল বলে।
৫.২ আঞ্চলিক ভূগোল
৫.২.১) উত্তর থেকে দক্ষিণে হিমালয়ের শ্রেণিবিভাগ করো এবং বৈশিষ্ট্য আলোচনা করো।
উত্তর: উচ্চতা ও ভূ-প্রকৃতি অনুসারে উত্তর থেকে দক্ষিণে হিমালয় পর্বতমালাকে চারটি সমান্তরাল শ্রেণিতে ভাগ করা যায়:
১) তেথিস বা ট্রান্স হিমালয়: এটি হিমালয়ের উত্তরে তিব্বত সংলগ্ন অংশে অবস্থিত। এর গড় উচ্চতা ৩০০০-৪০০০ মিটার। এখানে জাস্কার, লাদাখ ও কারাকোরাম পর্বতশ্রেণি দেখা যায়। এটি প্রধানত পাললিক শিলা দ্বারা গঠিত।
২) হিমাদ্রি বা উচ্চ হিমালয়: এটি সর্বোচ্চ পর্বতশ্রেণি, যার গড় উচ্চতা ৬০০০ মিটারের বেশি। এটি গ্রানাইট ও নিস শিলা দ্বারা গঠিত এবং সারাবছর বরফে ঢাকা থাকে। মাউন্ট এভারেস্ট, কাঞ্চনজঙ্ঘা প্রভৃতি শৃঙ্গ এখানে অবস্থিত।
৩) হিমাচল বা মধ্য হিমালয়: হিমাদ্রির দক্ষিণে অবস্থিত এই অংশের গড় উচ্চতা ৩৫০০-৪৫০০ মিটার। পীরপাঞ্জাল ও ধৌলাধর এখানকার প্রধান পর্বতশ্রেণি। কাশ্মীর উপত্যকা, কুলু, মানালি প্রভৃতি মনোরম উপত্যকা ও শৈলশহর এখানে দেখা যায়।
৪) শিবালিক বা অব-হিমালয়: এটি হিমালয়ের সর্বদক্ষিণে অবস্থিত নবীনতম অংশ। এর গড় উচ্চতা ৬০০-১৫০০ মিটার। এটি বালি, কাঁকর ও পলি দ্বারা গঠিত। শিবালিক ও হিমাচলের মাঝখানের উপত্যকাগুলিকে 'দুন' বলে (যেমন- দেরাদুন)।
৫.২.২) চা চাষের অনুকূল প্রাকৃতিক পরিবেশ আলোচনা করো।
উত্তর: চা একটি গুরুত্বপূর্ণ বাগিচা ও পানীয় ফসল। চা চাষের জন্য নিম্নলিখিত প্রাকৃতিক পরিবেশের প্রয়োজন হয়:
১) উষ্ণতা: চা চাষের জন্য উষ্ণ ও আর্দ্র জলবায়ু প্রয়োজন। ২০°C থেকে ৩০°C উষ্ণতা চা চাষের পক্ষে আদর্শ।
২) বৃষ্টিপাত: চা গাছের বৃদ্ধির জন্য প্রচুর বৃষ্টিপাতের প্রয়োজন হয়। বছরে ১৫০-২০০ সেমি বৃষ্টিপাত আদর্শ। তবে গাছের গোড়ায় জল জমলে চা গাছের ক্ষতি হয়, তাই নিয়মিত বৃষ্টিপাত হওয়া দরকার।
৩) আর্দ্রতা ও কুয়াশা: বাতাসে বেশি আর্দ্রতা এবং সকালে কুয়াশা থাকলে চা পাতার স্বাদ ও গন্ধ বৃদ্ধি পায়।
৪) মৃত্তিকা: লৌহমিশ্রিত দোআঁশ মাটি এবং হিউমাস বা জৈব পদার্থ সমৃদ্ধ মাটি চা চাষের পক্ষে উপযোগী। মাটি অবশ্যই অম্লধর্মী হতে হবে।
৫) জমির প্রকৃতি: গাছের গোড়ায় যাতে জল না জমে, সেজন্য পাহাড়ের ঢালু জমি চা চাষের জন্য শ্রেষ্ঠ। তাই পাহাড়ি অঞ্চলে ধাপ কেটে চা চাষ করা হয়।
৬) ছায়াপ্রদানকারী বৃক্ষ: প্রখর রোদ থেকে চা গাছকে রক্ষা করার জন্য চা বাগানে মাঝেমধ্যে বড় বড় গাছ (যেমন- সিলভার ওক) লাগানো হয়।
৫.২.৩) পূর্বভারতে লৌহ-ইস্পাত শিল্প কেন্দ্রীভবনের পাঁচটি কারণ আলোচনা করো।
উত্তর: ভারতের দুর্গাপুর, জামশেদপুর, রৌরকেলা, বোকারো প্রভৃতি স্থানে অর্থাৎ পূর্ব ও মধ্য ভারতে লৌহ-ইস্পাত শিল্পের একদেশীভবন বা কেন্দ্রীভবনের প্রধান কারণগুলি হলো:
১) আকরিক লোহা: ওড়িশার গুরুমহিষাণী, বাদামপাহাড় এবং ঝাড়খণ্ডের নোয়ামুন্ডি, কিবুরু থেকে প্রচুর উন্নত মানের আকরিক লোহা পাওয়া যায়।
২) কয়লা: এই অঞ্চলের কাছাকাছি রাণীগঞ্জ, ঝরিয়া, বোকারো, গিরিডি প্রভৃতি কয়লাখনি থেকে প্রয়োজনীয় কোক কয়লা সহজলভ্য।
৩) অন্যান্য খনিজ দ্রব্য: ইস্পাত তৈরির জন্য প্রয়োজনীয় চুনাপাথর, ডলোমাইট ও ম্যাঙ্গানিজ ওড়িশার গাংপুর ও বীরমিত্রপুর থেকে সহজেই পাওয়া যায়।
৪) জলের যোগান: দামোদর, সুবর্ণরেখা, খরকাই, ব্রাহ্মণী ও মহানদী থেকে শিল্পের প্রয়োজনীয় প্রচুর জল পাওয়া যায়।
৫) পরিবহণ ও বন্দর: পূর্ব ও দক্ষিণ-পূর্ব রেলপথের মাধ্যমে উন্নত পরিবহণ ব্যবস্থা এবং কলকাতা, হলদিয়া ও পারাদ্বীপ বন্দরের নৈকট্য যন্ত্রপাতি আমদানি ও পণ্য রপ্তানিতে সুবিধা করে দিয়েছে। এছাড়া সস্তা শ্রমিক ও দামোদর ভ্যালি করপোশেন (DVC) থেকে বিদ্যুতের যোগান এই শিল্পের উন্নতিতে সাহায্য করেছে।
৫.২.৪) উদাহরণসহ ভারতে শহর ও নগর গড়ে ওঠার পাঁচটি কারণ আলোচনা করো।
উত্তর: ভারতে বিভিন্ন কারণে শহর বা নগর গড়ে ওঠে। এর প্রধান পাঁচটি কারণ উদাহরণসহ নিচে দেওয়া হলো:
১) শিল্পায়ন: কোনো স্থানে বৃহৎ শিল্প গড়ে উঠলে তাকে কেন্দ্র করে জনবসতি বাড়ে এবং শহরের সৃষ্টি হয়। একে শিল্পশহর বলে। যেমন- জামশেদপুর (লৌহ-ইস্পাত), আমেদাবাদ (বস্ত্রবয়ন)।
২) পরিবহণ ও বাণিজ্য: নদী বা সমুদ্রের তীরবর্তী স্থানে বা রেল জংশন পয়েন্টে ব্যবসার সুবিধার্থে শহর গড়ে ওঠে। যেমন- কলকাতা, মুম্বাই (বন্দর নগর), মুঘলসরাই (রেল শহর)।
৩) প্রশাসনিক কাজকর্ম: রাজ্যের রাজধানী বা জেলা সদরকে কেন্দ্র করে প্রশাসনিক কাজের সুবিধার্থে শহর গড়ে ওঠে। যেমন- নতুন দিল্লি, চণ্ডীগড়, ভুবনেশ্বর।
৪) ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক গুরুত্ব: কোনো বিখ্যাত মন্দির বা তীর্থস্থানকে কেন্দ্র করে বা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে কেন্দ্র করে শহর গড়ে ওঠে। যেমন- বারাণসী, পুরী (ধর্মীয় শহর), শান্তিনিকেতন (শিক্ষা শহর)।
৫) পর্যটন কেন্দ্র: পাহাড় বা সমুদ্রতীরে মনোরম জলবায়ু ও প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের কারণে পর্যটন কেন্দ্র বা স্বাস্থ্যনিবাস গড়ে ওঠে। যেমন- দার্জিলিং, সিমলা, দিঘা।