৪.১ পরিবেশের ওপর বর্জ্যের তিনটি প্রভাব সংক্ষেপে আলোচনা করো। অথবা, বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় শিক্ষার্থীদের তিনটি ভূমিকা আলোচনা করো।
পরিবেশের ওপর বর্জ্যের প্রভাব: ১) মৃত্তিকা দূষণ: প্লাস্টিক, রাসায়নিক ও অন্যান্য কঠিন বর্জ্য মাটিতে মিশে মাটির উর্বরতা নষ্ট করে এবং বিষাক্ত করে তোলে। ২) জল দূষণ: শিল্প ও গৃহস্থালির বর্জ্য জল নদী বা জলাশয়ে মিশে জলজ বাস্তুতন্ত্র নষ্ট করে এবং জল বাহিত রোগ ছড়ায়। ৩) বায়ু দূষণ: বর্জ্য পদার্থ পোড়ানোর ফলে বা পচনের ফলে মিথেন, কার্বন মনোক্সাইডের মতো ক্ষতিকারক গ্যাস বাতাসে মিশে বায়ুর গুণমান নষ্ট করে।
অথবা, শিক্ষার্থীদের ভূমিকা: ১) সচেতনতা বৃদ্ধি: শিক্ষার্থীরা নিজেরা বর্জ্য সম্পর্কে সচেতন হবে এবং পরিবার ও সমাজকে সচেতন করবে। ২) বর্জ্য হ্রাস: তারা প্লাস্টিক ব্যবহার কমিয়ে এবং জিনিসের অপচয় রোধ করে বর্জ্যের পরিমাণ কমাতে পারে। ৩) পৃথকীকরণ: বিদ্যালয়ে বা বাড়িতে পচনশীল ও অপচনশীল বর্জ্য আলাদা আলাদা পাত্রে ফেলার অভ্যাস গড়ে তুলতে পারে।
৪.২ উপগ্রহ চিত্র কী? অথবা, ভূ-বৈচিত্র্যসূচক মানচিত্র ও উপগ্রহ চিত্রের তিনটি পার্থক্য লেখো।
উপগ্রহ চিত্র: মহাকাশে স্থাপিত কৃত্রিম উপগ্রহে অবস্থিত সংবেদক বা সেন্সরের মাধ্যমে পৃথিবীর কোনো নির্দিষ্ট অঞ্চলের যে ছবি তোলা হয় বা তথ্য সংগ্রহ করা হয়, তাকে উপগ্রহ চিত্র বা স্যাটেলাইট ইমেজারি বলে। এটি ডিজিটাল প্রকৃতির হয়।
অথবা, পার্থক্য: ১) মাধ্যম: ভূ-বৈচিত্র্যসূচক মানচিত্র জরিপ কার্যের মাধ্যমে হাতে কলমে তৈরি হয়, কিন্তু উপগ্রহ চিত্র সেন্সরের মাধ্যমে ডিজিটাল পদ্ধতিতে তৈরি হয়। ২) স্কেল: ভূ-বৈচিত্র্যসূচক মানচিত্রের স্কেল নির্দিষ্ট থাকে, উপগ্রহ চিত্রের স্কেল পরিবর্তনযোগ্য। ৩) সময়: ভূ-বৈচিত্র্যসূচক মানচিত্র তৈরি করতে অনেক সময় লাগে, কিন্তু উপগ্রহ চিত্র খুব দ্রুত ও রিয়েল টাইমে পাওয়া যায়।
৪.৩ সার্ক ও অ্যারেত কীভাবে গঠিত হয়? অথবা, বায়ুর অবঘর্ষ ও ঘর্ষণ ক্ষয়ের তিনটি পার্থক্য লেখো।
সার্ক ও অ্যারেত গঠন: পার্বত্য অঞ্চলে হিমবাহের উৎপাটন ও অবঘর্ষ ক্ষয়ের ফলে পর্বতের গায়ে আরামকেদারার মতো যে ভূমিরূপ সৃষ্টি হয়, তাকে সার্ক বা করি বলে। পাশাপাশি অবস্থিত দুটি সার্কের মধ্যবর্তী অংশ ক্ষয়প্রাপ্ত হয়ে যে তীক্ষ্ণ ও ধারালো শৈলশিরা বা প্রাচীরের মতো অবস্থান করে, তাকে অ্যারেত বলে।
অথবা, অবঘর্ষ ও ঘর্ষণ ক্ষয়ের পার্থক্য: ১) প্রক্রিয়া: অবঘর্ষ প্রক্রিয়ায় বায়ুবাহিত বালুকণা শিলাগাত্রে আঘাত করে ক্ষয় করে, কিন্তু ঘর্ষণ ক্ষয়ে বালুকণাগুলি নিজেদের মধ্যে ঠোকাঠুকি করে ক্ষয়প্রাপ্ত হয়। ২) ফলাফল: অবঘর্ষের ফলে গৌর, ইনসেলবার্জ সৃষ্টি হয়, ঘর্ষণের ফলে বালুকণাগুলি আরও সূক্ষ্ম ধূলিকণায় পরিণত হয়। ৩) স্থান: অবঘর্ষ শিলাগাত্রে ঘটে, ঘর্ষণ বায়ুমণ্ডলে ভাসমান কণাগুলির মধ্যে ঘটে।
৪.৪ জেট বায়ু ও ভারতীয় মৌসুমি বায়ু ব্যবস্থার সম্পর্ক কী? অথবা, ভারতে অরণ্য সংরক্ষণের তিনটি পদ্ধতি বর্ণনা করো।
জেট বায়ু ও মৌসুমি বায়ু: ভারতের জলবায়ুতে জেট বায়ুর প্রভাব অপরিসীম। শীতকালে উপক্রান্তীয় পশ্চিমী জেট বায়ু হিমালয়ের দক্ষিণে অবস্থান করে এবং উত্তর ভারতে শৈত্যপ্রবাহ ও পশ্চিমী ঝঞ্ঝা সৃষ্টি করে। গ্রীষ্মকালে তিব্বত মালভূমি উত্তপ্ত হলে পুবালি জেট বায়ুর সৃষ্টি হয়, যা দক্ষিণ-পশ্চিম মৌসুমি বায়ুকে ভারতে প্রবেশ করতে সাহায্য করে এবং প্রচুর বৃষ্টিপাত ঘটায়।
অথবা, অরণ্য সংরক্ষণ পদ্ধতি: ১) বৃক্ষরোপণ: নির্বিচারে গাছ কাটা বন্ধ করে বনসৃজন ও সামাজিক বনসৃজনের মাধ্যমে নতুন গাছ লাগানো। ২) দাবানল রোধ: বনের শুকনো পাতা ও ডালপালা পরিষ্কার করে এবং নজরদারি বাড়িয়ে দাবানল থেকে বন রক্ষা করা। ৩) পশুচারণ নিয়ন্ত্রণ: অনিয়ন্ত্রিত পশুচারণ বন্ধ করা যাতে চারাগাছ নষ্ট না হয় এবং মাটির ক্ষয় রোধ করা যায়।
বিভাগ 'ঙ' : ৫.১ যেকোনো দুটি প্রশ্নের উত্তর দাও (৫ x ২ = ১০)
৫.১.১ নদীর সঞ্চয় কার্যের ফলে গঠিত তিনটি ভূমিরূপের চিত্রসহ আলোচনা করো।
উত্তর: নদীর সঞ্চয় কার্যের ফলে গঠিত তিনটি প্রধান ভূমিরূপ হলো:
১) পলল শঙ্কু (Alluvial Fan): নদীর উচ্চগতি থেকে মধ্যগতিতে বা সমভূমিতে প্রবেশের মুখে ভূমির ঢাল হঠাৎ কমে যায়। এর ফলে নদীর বহন ক্ষমতা কমে যায় এবং নদীগর্ভস্থ বালি, পলি, নুড়ি পর্বতের পাদদেশে শঙ্কুর আকারে সঞ্চিত হয়। হাতপাখার মতো দেখতে হলে একে পলল ব্যজনীও বলা হয়। হিমালয়ের পাদদেশে এরূপ ভূমিরূপ দেখা যায়।
২) নদী বাঁক (River Meander): সমভূমিতে নদীর গতিবেগ কম থাকায় নদী সামান্য বাধাতেই এঁকেবেঁকে প্রবাহিত হয়। নদীর এই সর্পিল গতিপথকে নদী বাঁক বা মিয়েন্ডার বলে। তুরস্কের মিয়েন্ডার নদীর নামানুসারে এর নামকরণ হয়েছে। বাঁকের যে দিকে জলস্রোত আঘাত করে সেখানে ক্ষয় হয় এবং বিপরীত দিকে পলি সঞ্চিত হয়ে ঢালু পাড় গঠিত হয়। গঙ্গা নদীর মধ্য ও নিম্নগতিতে প্রচুর নদী বাঁক দেখা যায়।
৩) অশ্বক্ষুরাকৃতি হ্রদ (Ox-bow Lake): নদী বাঁক যখন খুব বেশি হয়, তখন নদীর দুই বাঁকের মধ্যবর্তী স্থান ক্ষয় হতে হতে খুব সংকীর্ণ হয়ে পড়ে। প্রবল বন্যার সময় নদী ওই বাঁকানো পথ ত্যাগ করে সোজা পথে প্রবাহিত হয়। তখন পরিত্যক্ত বাঁকটি হ্রদরূপে অবস্থান করে, যা ঘোড়ার ক্ষুরের মতো দেখতে হয় বলে একে অশ্বক্ষুরাকৃতি হ্রদ বলে। মুর্শিদাবাদের কাছে গঙ্গা নদীর গতিপথে এরকম হ্রদ দেখা যায়।
৫.১.২ সমুদ্রস্রোত সৃষ্টির কারণগুলি আলোচনা করো।
উত্তর: সমুদ্রস্রোত সৃষ্টির প্রধান কারণগুলি নিম্নরূপ:
১) নিয়ত বায়ুপ্রবাহ: সমুদ্রস্রোত সৃষ্টির প্রধান কারণ হলো নিয়ত বায়ুপ্রবাহ। আয়ন বায়ু, পশ্চিমা বায়ু ও মেরু বায়ু সমুদ্রের ওপর দিয়ে প্রবাহিত হওয়ার সময় জলরাশিকে নির্দিষ্ট দিকে তাড়িয়ে নিয়ে যায়। উদাহরণস্বরূপ, আয়ন বায়ুর প্রভাবে নিরক্ষীয় স্রোত পূর্ব থেকে পশ্চিমে প্রবাহিত হয় এবং পশ্চিমা বায়ুর প্রভাবে পশ্চিম থেকে পূর্বে প্রবাহিত হয়।
২) পৃথিবীর আবর্তন গতি: পৃথিবীর আবর্তনের ফলে সৃষ্ট করিওলিস বলের প্রভাবে সমুদ্রস্রোত সোজাপথে প্রবাহিত না হয়ে উত্তর গোলার্ধে ডানদিকে এবং দক্ষিণ গোলার্ধে বামদিকে বেঁকে প্রবাহিত হয়। একে ফেরেলের সূত্র বলে।
৩) সমুদ্রজলের উষ্ণতার পার্থক্য: নিরক্ষীয় অঞ্চলে সূর্যরশ্মি লম্বভাবে পড়ার ফলে জল উষ্ণ ও হালকা হয়ে বহিঃস্রোত রূপে মেরু অঞ্চলের দিকে প্রবাহিত হয়। অন্যদিকে মেরু অঞ্চলের শীতল ও ভারী জল অন্তঃস্রোত রূপে নিরক্ষীয় অঞ্চলের দিকে প্রবাহিত হয়।
৪) লবণাক্ততা ও ঘনত্ব: অধিক লবণাক্ত জল ভারী হওয়ায় নিচের দিকে নেমে যায় এবং কম লবণাক্ত জল হালকা হওয়ায় ওপর দিয়ে প্রবাহিত হয়। ঘনত্বের এই তারতম্যের কারণে অন্তঃস্রোত ও বহিঃস্রোতের সৃষ্টি হয়।
৫) মহাদেশের আকৃতি: সমুদ্রস্রোতের প্রবাহপথে কোনো মহাদেশ বা ভূখণ্ড অবস্থান করলে স্রোত তাতে বাধা পেয়ে দিক পরিবর্তন করে বা একাধিক শাখায় বিভক্ত হয়ে যায়। যেমন- আটলান্টিক মহাসাগরের দক্ষিণ নিরক্ষীয় স্রোত ব্রাজিলের সেন্ট রক্ অন্তরীপে বাধা পেয়ে দুটি শাখায় বিভক্ত হয়।
৫.১.৩ শৈলোৎক্ষেপ বৃষ্টিপাতের প্রক্রিয়া উপযুক্ত চিত্রসহ আলোচনা করো।
উত্তর: শৈলোৎক্ষেপ বৃষ্টিপাত (Orographic Rainfall):
'শৈল' কথার অর্থ পর্বত এবং 'উৎক্ষেপ' কথার অর্থ ওপরে ওঠা। জলীয় বাষ্পপূর্ণ বায়ু ভূপৃষ্ঠের ওপর দিয়ে প্রবাহিত হওয়ার সময় যদি কোনো উঁচু পর্বত বা মালভূমিতে বাধা পায়, তবে সেই বায়ু পর্বতের গা বেয়ে ওপরে উঠে যায়। ওপরে উঠলে বায়ু প্রসারিত ও শীতল হয় এবং বায়ুর জলীয় বাষ্প ঘনীভূত হয়ে মেঘে পরিণত হয়। এই মেঘ থেকে পর্বতের যে ঢালে বায়ু বাধা পায় অর্থাৎ প্রতিবাত ঢালে (Windward side) প্রচুর বৃষ্টিপাত ঘটায়। এই ধরনের বৃষ্টিপাতকে শৈলোৎক্ষেপ বৃষ্টিপাত বলে।
বৃষ্টিচ্ছায় অঞ্চল: প্রতিবাত ঢালে বৃষ্টিপাত ঘটানোর পর বায়ু যখন পর্বত অতিক্রম করে অনুবাত ঢালে (Leeward side) পৌঁছায়, তখন তাতে জলীয় বাষ্প খুব কম থাকে। এছাড়া বায়ু নিচের দিকে নামার ফলে উষ্ণতা বাড়ে এবং জলীয় বাষ্প ধারণ ক্ষমতা বৃদ্ধি পায়। ফলে অনুবাত ঢালে বৃষ্টিপাত খুব কম হয় বা হয় না বললেই চলে। এই অঞ্চলকে বৃষ্টিচ্ছায় অঞ্চল বলে। উদাহরণ: দক্ষিণ-পশ্চিম মৌসুমি বায়ু পশ্চিমঘাট পর্বতের পশ্চিম ঢালে বাধা পেয়ে প্রচুর বৃষ্টিপাত ঘটায়, কিন্তু পূর্ব ঢালে অবস্থিত দাক্ষিণাত্য মালভূমি অঞ্চলে বৃষ্টিপাত কম হয়, তাই এটি বৃষ্টিচ্ছায় অঞ্চল।
৫.১.৪ আয়ন বায়ু ও পশ্চিমা বায়ুর পাঁচটি বৈশিষ্ট্য লেখো।
উত্তর: আয়ন বায়ু ও পশ্চিমা বায়ুর বৈশিষ্ট্যগুলি নিচে আলোচনা করা হলো:
আয়ন বায়ুর বৈশিষ্ট্য: ১) অবস্থান: কর্কটীয় ও মকরীয় উচ্চচাপ বলয় থেকে নিরক্ষীয় নিম্নচাপ বলয়ের দিকে প্রবাহিত হয়। ২) দিক: উত্তর গোলার্ধে উত্তর-পূর্ব এবং দক্ষিণ গোলার্ধে দক্ষিণ-পূর্ব দিক থেকে প্রবাহিত হয়। ৩) গতিবেগ: এই বায়ুর গতিবেগ নিয়মিত ও নির্দিষ্ট (ঘণ্টায় ১৬-২২ কিমি)। প্রাচীনকালে এই বায়ুর সাহায্যে পালতোলা জাহাজ চলাচল করত বলে একে বাণিজ্য বায়ু বলা হয়। ৪) বৃষ্টিপাত: মহাদেশের পূর্বভাগে এই বায়ু প্রচুর বৃষ্টিপাত ঘটায়, কিন্তু পশ্চিমভাগে শুষ্ক থাকে বলে সেখানে মরুভূমি সৃষ্টি হয়েছে।
পশ্চিমা বায়ুর বৈশিষ্ট্য: ১) অবস্থান: কর্কটীয় ও মকরীয় উচ্চচাপ বলয় থেকে মেরুবৃত্ত প্রদেশীয় নিম্নচাপ বলয়ের দিকে প্রবাহিত হয়। ২) দিক: উত্তর গোলার্ধে দক্ষিণ-পশ্চিম এবং দক্ষিণ গোলার্ধে উত্তর-পশ্চিম দিক থেকে প্রবাহিত হয়। ৩) গতিবেগ: উত্তর গোলার্ধে স্থলভাগ বেশি থাকায় গতিবেগ কম, কিন্তু দক্ষিণ গোলার্ধে জলভাগ বেশি থাকায় প্রবল বেগে প্রবাহিত হয় (গর্জনশীল চল্লিশা)। ৪) আবহাওয়া: এই বায়ুর প্রভাবে আবহাওয়া পরিবর্তনশীল এবং নাতিশীতোষ্ণ ঘূর্ণবাত ও ঝঞ্ঝার সৃষ্টি হয়। মহাদেশের পশ্চিমভাগে এই বায়ু বৃষ্টিপাত ঘটায়।
৫.২ যেকোনো দুটি প্রশ্নের উত্তর দাও (৫ x ২ = ১০)
৫.২.১ ভারতের জলবায়ু নিয়ন্ত্রণে পাঁচটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ উল্লেখ করো।
উত্তর: ভারতের জলবায়ু নিয়ন্ত্রণের প্রধান পাঁচটি কারণ হলো:
১) অক্ষাংশগত অবস্থান: কর্কটক্রান্তি রেখা ভারতের প্রায় মাঝখান দিয়ে অতিক্রম করেছে। ফলে দক্ষিণ ভারত উষ্ণমণ্ডল এবং উত্তর ভারত উপক্রান্তীয় মণ্ডলের অন্তর্গত। এর প্রভাবে দক্ষিণ ভারতে সারা বছর উষ্ণতা বেশি থাকে এবং উত্তর ভারতে গ্রীষ্মকালে খুব গরম ও শীতকালে খুব ঠান্ডা অনুভূত হয়।
২) হিমালয় পর্বতের অবস্থান: ভারতের উত্তরে প্রাচীরের মতো দণ্ডায়মান হিমালয় পর্বত সাইবেরিয়ার হিমশীতল বাতাসকে ভারতে প্রবেশে বাধা দেয়, ফলে শীতের প্রকোপ কমে। আবার দক্ষিণ-পশ্চিম মৌসুমি বায়ু হিমালয়ে বাধা পেয়ে ভারতে প্রচুর বৃষ্টিপাত ঘটায়।
৩) সমুদ্র থেকে দূরত্ব: ভারতের তিন দিকে সমুদ্র বেষ্টিত। উপকূলবর্তী অঞ্চলগুলিতে সমুদ্রবায়ু ও স্থলবায়ুর প্রভাবে জলবায়ু সমভাবাপন্ন (নাতিশীতোষ্ণ) থাকে। কিন্তু সমুদ্র থেকে দূরে অবস্থিত দিল্লি, পাঞ্জাব প্রভৃতি স্থানে চরমভাবাপন্ন জলবায়ু দেখা যায়।
৪) মৌসুমি বায়ু: ভারতের জলবায়ু মূলত মৌসুমি বায়ুর ওপর নির্ভরশীল। এই বায়ুর আগমনে বর্ষাকাল শুরু হয় এবং প্রত্যাগমনে শীতকাল। বৃষ্টিপাতের বণ্টনও এই বায়ুর দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হয়।
৫) ভূ-প্রকৃতি ও উচ্চতা: উচ্চতা বাড়লে উষ্ণতা কমে। তাই একই অক্ষাংশে অবস্থিত হলেও সমভূমির তুলনায় পাহাড়ি অঞ্চল (যেমন- দার্জিলিং, সিমলা) বেশি শীতল হয়। এছাড়া পর্বতের প্রতিবাত ঢালে বৃষ্টিপাত বেশি হয় এবং অনুবাত ঢালে বৃষ্টিপাত কম হয়।
৫.২.২ কফি চাষের অনুকূল ভৌগোলিক পরিবেশগুলি কী কী?
উত্তর: কফি চাষের জন্য নিম্নলিখিত ভৌগোলিক পরিবেশ প্রয়োজন:
ক) প্রাকৃতিক পরিবেশ:
১) উষ্ণতা: কফি চাষের জন্য উষ্ণ ও আর্দ্র আবহাওয়া প্রয়োজন। ২০° থেকে ৩০° সেলসিয়াস উষ্ণতা কফি চাষের পক্ষে আদর্শ।
২) বৃষ্টিপাত: ১৫০ থেকে ২০০ সেমি বৃষ্টিপাত প্রয়োজন। তবে ফলের বৃদ্ধি ও পাকার সময় শুষ্ক আবহাওয়া দরকার।
৩) ছায়াপ্রদানকারী বৃক্ষ: কফি গাছ সরাসরি প্রখর রোদ ও ঝড়বৃষ্টি সহ্য করতে পারে না, তাই কফি বাগিচায় বড় বড় ছায়াপ্রদানকারী গাছ (যেমন- কলা, ওক) লাগানো হয়।
৪) মৃত্তিকা ও ভূমি: উর্বর দোআঁশ মাটি, লাভা গঠিত মাটি ও লাল মাটি কফি চাষের জন্য ভালো। জল নিকাশি ব্যবস্থা যুক্ত পাহাড়ি ঢালু জমি প্রয়োজন, কারণ গাছের গোড়ায় জল জমলে ক্ষতি হয়।
খ) অর্থনৈতিক পরিবেশ:
১) শ্রমিক: কফি গাছ লাগানো, পরিচর্যা করা, ফল তোলা ও প্রক্রিয়াকরণের জন্য প্রচুর সুলভ ও দক্ষ শ্রমিকের প্রয়োজন হয়।
২) মূলধন ও পরিবহন: বাগিচা তৈরি, সার ও কীটনাশক প্রয়োগ এবং রক্ষণাবেক্ষণের জন্য প্রচুর মূলধনের প্রয়োজন। এছাড়া উৎপাদিত কফি দ্রুত বাজারে বা বন্দরে পাঠানোর জন্য উন্নত পরিবহন ব্যবস্থা দরকার। দক্ষিণ ভারতের কর্ণাটক, কেরল ও তামিলনাড়ুতে কফি চাষ সবচেয়ে বেশি হয়।
৫.২.৩ লৌহ-ইস্পাত শিল্পের অবস্থান গড়ে ওঠার কারণগুলি বিশ্লেষণ করো।
উত্তর: লৌহ-ইস্পাত শিল্প একটি ভারী শিল্প এবং এর অবস্থান মূলত কাঁচামালের সহজলভ্যতার ওপর নির্ভর করে। এর গড়ে ওঠার প্রধান কারণগুলি হলো:
১) কাঁচামালের সহজলভ্যতা: এই শিল্পের প্রধান কাঁচামাল হলো আকরিক লোহা, কয়লা, চুনাপাথর, ডলোমাইট ও ম্যাঙ্গানিজ। এগুলি সবই ভারী ও অবিশুদ্ধ প্রকৃতির। তাই পরিবহন ব্যয় কমানোর জন্য সাধারণত খনি অঞ্চলের কাছেই এই শিল্প গড়ে ওঠে। যেমন- জামশেদপুর, রৌরকেল্লা।
২) শক্তি সম্পদ: ইস্পাত গলানোর জন্য প্রচুর তাপশক্তির প্রয়োজন, যা মূলত কয়লা থেকে আসে। তাই কয়লাখনি অঞ্চলের নিকটে এই শিল্প গড়ে ওঠা লাভজনক। যেমন- দুর্গাপুর, বার্নপুর।
৩) জলের যোগান: চুল্লি ঠান্ডা রাখার জন্য এবং ইস্পাত ধোয়ার জন্য প্রচুর জলের প্রয়োজন হয়। তাই বড় কোনো নদী বা জলাশয়ের তীরে এই শিল্প গড়ে ওঠে। যেমন- দামোদর, সুবর্ণরেখা নদী।
৪) উন্নত পরিবহন: ভারী কাঁচামাল আমদানি এবং উৎপাদিত ইস্পাত বাজারে পাঠানোর জন্য উন্নত রেলপথ ও সড়কপথের প্রয়োজন হয়।
৫) বন্দর ও বাজার: আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের সুবিধা এবং দেশের অভ্যন্তরে চাহিদা মেটানোর জন্য বন্দরের নৈকট্য ও বড় বাজারের উপস্থিতি এই শিল্পের বিকাশে সাহায্য করে। যেমন- বিশাখাপত্তনম ইস্পাত কেন্দ্র বন্দরের সুবিধায় গড়ে উঠেছে।
৫.২.৪ ভারতের পশ্চিম ও পূর্ব উপকূলীয় সমভূমির পাঁচটি পার্থক্য লেখো।
উত্তর: ভারতের পশ্চিম ও পূর্ব উপকূলীয় সমভূমির পার্থক্যগুলি হলো:
১) অবস্থান ও বিস্তার: পশ্চিম উপকূলীয় সমভূমি আরব সাগর ও পশ্চিমঘাট পর্বতের মাঝে অবস্থিত এবং এটি বেশ সংকীর্ণ (গড় প্রস্থ ১০-৬৫ কিমি)। পূর্ব উপকূলীয় সমভূমি বঙ্গোপসাগর ও পূর্বঘাট পর্বতের মাঝে অবস্থিত এবং এটি বেশ চওড়া (গড় প্রস্থ ৮০-১০০ কিমি)।
২) বদ্বীপ গঠন: পশ্চিম উপকূলের নদীগুলি ছোট ও খরস্রোতা হওয়ায় এখানে কোনো বদ্বীপ গঠিত হয়নি, কেবল মোহনা বা এশ্চুয়ারি দেখা যায়। কিন্তু পূর্ব উপকূলের নদীগুলি (মহানদী, গোদাবরী, কৃষ্ণা, কাবেরী) বিশাল বদ্বীপ গঠন করেছে।
৩) উপকূলের প্রকৃতি: পশ্চিম উপকূল খুব ভগ্ন বা দন্তুর, তাই এখানে অনেক স্বাভাবিক পোতাশ্রয় ও বন্দর গড়ে উঠেছে (যেমন- মুম্বাই, কোচিন)। পূর্ব উপকূল খুব একটা ভগ্ন নয়, তাই স্বাভাবিক বন্দরের সংখ্যা কম, বেশিরভাগই কৃত্রিম বন্দর (যেমন- চেন্নাই)।
৪) ভূ-প্রকৃতি: পশ্চিম উপকূলে কয়াল বা ব্যাকওয়াটার (কেরলে) দেখা যায়। পূর্ব উপকূলে বালিয়াড়ি এবং উপহ্রদ বা লেগুন (চিল্কা, পুলিকট) দেখা যায়।
৫) বৃষ্টিপাত: পশ্চিম উপকূলে দক্ষিণ-পশ্চিম মৌসুমি বায়ুর প্রভাবে প্রচুর বৃষ্টিপাত হয় (২০০-৪০০ সেমি)। পূর্ব উপকূলে বৃষ্টিপাতের পরিমাণ অপেক্ষাকৃত কম এবং এখানে বছরে দুবার বৃষ্টিপাত হয় (করমণ্ডল উপকূলে)।