৪.১ অনুদৈর্ঘ্য ও তির্যক বালিয়াড়ির মধ্যে পার্থক্য লেখো। অথবা, ভরা কোটাল ও মরা কোটালের মধ্যে তুলনামূলক আলোচনা করো।
অনুদৈর্ঘ্য ও তির্যক বালিয়াড়ির পার্থক্য: ১) অবস্থান: অনুদৈর্ঘ্য বালিয়াড়ি বায়ুপ্রবাহের সমান্তরালে গড়ে ওঠে, কিন্তু তির্যক বালিয়াড়ি বায়ুপ্রবাহের আড়াআড়িভাবে গড়ে ওঠে। ২) আকৃতি: অনুদৈর্ঘ্য বালিয়াড়ি দেখতে অনেকটা তরবারির মতো দীর্ঘাকার হয় (সিফ), আর তির্যক বালিয়াড়ি অর্ধচন্দ্রাকার হয় (বারখান)। ৩) বায়ুর বেগ: বায়ুর বেগ বেশি হলে অনুদৈর্ঘ্য এবং মাঝারি হলে তির্যক বালিয়াড়ি সৃষ্টি হয়।
অথবা, ভরা ও মরা কোটালের পার্থক্য: ১) তিথি: ভরা কোটাল অমাবস্যা ও পূর্ণিমা তিথিতে হয়, কিন্তু মরা কোটাল কৃষ্ণ ও শুক্ল পক্ষের অষ্টমী তিথিতে হয়। ২) অবস্থান: ভরা কোটালে পৃথিবী, চাঁদ ও সূর্য একই সরলরেখায় থাকে (সিজিগি), কিন্তু মরা কোটালে চাঁদ ও সূর্য পৃথিবীর সাথে সমকোণে থাকে। ৩) জলস্ফীতি: ভরা কোটালে জলস্ফীতি বা জোয়ারের প্রাবল্য খুব বেশি হয়, মরা কোটালে তা তুলনায় কম হয়।
৪.২ উষ্ণ মরু অঞ্চলে বায়ুর কাজের প্রাধান্য দেখা যায় কেন?
উত্তর: উষ্ণ মরু অঞ্চলে বায়ুর কাজের প্রাধান্য বেশি হওয়ার কারণগুলি হলো: ১) উদ্ভিদহীনতা: মরু অঞ্চলে গাছপালা না থাকায় বায়ু বাধাহীনভাবে প্রবল বেগে প্রবাহিত হতে পারে, ফলে ক্ষয় ও বহন কাজ সহজ হয়। ২) যান্ত্রিক আবহবিকার: দিন ও রাতের প্রবল উষ্ণতার পার্থক্যের কারণে এখানে যান্ত্রিক আবহবিকারের ফলে শিলা চূর্ণবিচূর্ণ হয়ে আলগা বালি ও ধূলিকণায় পরিণত হয়, যা বায়ু সহজেই উড়িয়ে নিয়ে যেতে পারে। ৩) বৃষ্টিপাতের অভাব: বৃষ্টি কম হওয়ার কারণে মাটি শুষ্ক ও আলগা থাকে, যা বায়ুপ্রবাহের দ্বারা সহজেই স্থানান্তরিত হয়। এই কারণে মরুভূমিতে বায়ুই প্রধান প্রাকৃতিক শক্তি হিসেবে কাজ করে।
৪.৩ ভৌত অবস্থার ভিত্তিতে বর্জ্যের শ্রেণবিভাগ করো। অথবা, নদী উপত্যকা ও হিমবাহ উপত্যকার তিনটি পার্থক্য লেখো। অথবা, ভূ-সমলয় ও সূর্য-সমলয় উপগ্রহের পার্থক্য লেখো।
ভৌত অবস্থার ভিত্তিতে বর্জ্য তিন প্রকার: ১) কঠিন বর্জ্য: যেমন- প্লাস্টিক, কাচ, ধাতু, কাগজ ইত্যাদি। ২) তরল বর্জ্য: যেমন- নর্দমার নোংরা জল, কলকারখানার রাসায়নিক মিশ্রিত জল, তেলের গাদ ইত্যাদি। ৩) গ্যাসীয় বর্জ্য: যেমন- কলকারখানা ও যানবাহনের ধোঁয়া (CO2, CO), ধূলিকণা ইত্যাদি।
অথবা, নদী ও হিমবাহ উপত্যকার পার্থক্য: ১) আকৃতি: নদী উপত্যকা ইংরেজি 'I' বা 'V' আকৃতির হয়, কিন্তু হিমবাহ উপত্যকা ইংরেজি 'U' আকৃতির হয়। ২) সৃষ্টি: নদীর নিম্নক্ষয় ও পার্শ্বক্ষয়ের ফলে নদী উপত্যকা গঠিত হয়, আর হিমবাহের ঘর্ষণ ও উৎপাটন প্রক্রিয়ায় হিমবাহ উপত্যকা গঠিত হয়। ৩) ভূমিরূপ: নদী উপত্যকায় মন্থকূপ, জলপ্রপাত দেখা যায়, হিমবাহ উপত্যকায় ফিয়র্ড, ঝুলন্ত উপত্যকা দেখা যায়।
অথবা, ভূ-সমলয় ও সূর্য-সমলয় উপগ্রহ: ১) আবর্তন: ভূ-সমলয় উপগ্রহ পৃথিবীর আবর্তনের গতির সাথে সামঞ্জস্য রেখে ঘোরে, সূর্য-সমলয় উপগ্রহ সূর্যের আপাত গতির সাথে সামঞ্জস্য রেখে ঘোরে। ২) উচ্চতা: ভূ-সমলয় উপগ্রহ প্রায় ৩৬,০০০ কিমি উচ্চতায় থাকে, সূর্য-সমলয় উপগ্রহ ৭০০-৯০০ কিমি উচ্চতায় থাকে। ৩) কাজ: ভূ-সমলয় যোগাযোগ ব্যবস্থায় এবং সূর্য-সমলয় দূর সংবেদনে ব্যবহৃত হয়।
৪.৪ বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় শিক্ষার্থীদের যেকোনো তিনটি ভূমিকা লেখো। অথবা, জলপথের প্রধান সুবিধা ও অসুবিধাগুলি লেখো।
শিক্ষার্থীদের ভূমিকা: ১) সচেতনতা বৃদ্ধি: শিক্ষার্থীরা নিজেরা বর্জ্য সম্পর্কে সচেতন হবে এবং পরিবার ও প্রতিবেশীদের সচেতন করবে। ২) বর্জ্য পৃথকীকরণ: তারা বাড়িতে পচনশীল ও অপচনশীল বর্জ্য আলাদা ঝুড়িতে রাখার অভ্যাস করবে। ৩) পুনর্ব্যবহার: খাতা, পেন, প্লাস্টিক বোতল ইত্যাদি জিনিসের অপচয় না করে সেগুলির পুনর্ব্যবহার বা রিসাইক্লিং-এর ওপর জোর দেবে।
অথবা, জলপথের সুবিধা ও অসুবিধা: সুবিধা- ১) এটি সবচেয়ে সস্তা পরিবহন মাধ্যম। ২) ভারী ও বিশাল পরিমাণ পণ্য পরিবহনে এটি আদর্শ। ৩) এতে পরিবেশ দূষণ কম হয়। অসুবিধা- ১) এটি অত্যন্ত ধীরগতির পরিবহন ব্যবস্থা। ২) ঋতুভেদে বা জলস্তর কমে গেলে সব সময় নৌপরিবহন সম্ভব হয় না। ৩) সব স্থানে নদী বা সমুদ্র না থাকায় এর বিস্তার সীমাবদ্ধ।
বিভাগ 'ঙ' : ৫.১ যেকোনো দুটি প্রশ্নের উত্তর দাও (৫ x ২ = ১০)
৫.১.১ শুষ্ক অঞ্চলে বায়ু ও জলধারার মিলিত কার্যের ফলে গঠিত ভূমিরূপগুলি চিত্রসহ বর্ণনা করো।
উত্তর: মরুভূমি বা শুষ্ক অঞ্চলে বায়ু ও জলধারার মিলিত কার্যের ফলে নিম্নলিখিত ভূমিরূপগুলি গঠিত হয়:
১) ওয়াদি (Wadi): মরুভূমিতে হঠাৎ বৃষ্টির ফলে সাময়িক জলধারার সৃষ্টি হয়। এই জলধারাগুলি শুকিয়ে গেলে যে শুষ্ক নদীখাতের সৃষ্টি হয়, তাকে ওয়াদি বলে। এগুলি বছরের বেশিরভাগ সময় শুষ্ক থাকে।
২) পেডিমেন্ট (Pediment): মরু অঞ্চলের পর্বতের পাদদেশে ক্ষয়জাত পদার্থ বাহিত হয়ে যে মৃদু ঢালু সমতল শিলাতলের সৃষ্টি হয়, তাকে পেডিমেন্ট বলে। এর ঢাল সাধারণত ১° থেকে ৭° এর মধ্যে হয়। এল.সি. কিং এর মতে এটি পর্বতের পশ্চাদপসরণের ফলে গঠিত হয়।
৩) বাজাদা (Bajada): পেডিমেন্টের নিচে একাধিক পলল ব্যজনী বা পলল শঙ্কু পাশাপাশি জুড়ে গিয়ে যে বিস্তীর্ণ সমভূমি গঠন করে, তাকে বাজাদা বলে। এটি নুড়ি, বালি ও পলি দ্বারা গঠিত সঞ্চয়জাত ভূমিরূপ।
৪) প্লায়া (Playa): মরুভূমি বা পর্বতবেষ্টিত অঞ্চলের কেন্দ্রস্থলে অবস্থিত অবনত ভূমিতে জল জমে যে সাময়িক লবণাক্ত হ্রদের সৃষ্টি হয়, তাকে প্লায়া বলে। তীব্র বাষ্পীভবনের কারণে এর জল খুব লবণাক্ত হয়। উত্তর আমেরিকায় একে প্লায়া, সাহারায় শটস্ এবং রাজস্থানে ধান্দ বা রান বলা হয়।
৫.১.২ নদীর মধ্যগতিতে সঞ্চয় কার্যের ফলে গঠিত তিনটি ভূমিরূপের চিত্রসহ বর্ণনা করো।
উত্তর: নদীর মধ্যগতিতে ভূমির ঢাল কমে যাওয়ায় নদীর বহন ক্ষমতা কমে যায় এবং সঞ্চয় কাজ প্রাধান্য পায়। এর ফলে গঠিত প্রধান ভূমিরূপগুলি হলো:
১) পলল শঙ্কু বা পলল ব্যজনী (Alluvial Fan): নদী যখন পার্বত্য অঞ্চল ছেড়ে সমভূমিতে প্রবেশ করে, তখন ভূমির ঢাল হঠাৎ কমে যায়। ফলে নদীবাহিত বালি, নুড়ি, পাথর ইত্যাদি পর্বতের পাদদেশে শঙ্কুর আকারে সঞ্চিত হয়। একে পলল শঙ্কু বলে। এটি দেখতে হাতপাখার মতো হলে তাকে পলল ব্যজনী বলা হয়।
২) নদী বাঁক (River Meander): মধ্যগতিতে নদীর গতিবেগ কমে যাওয়ায় সামনে কোনো বাধা পেলে নদী তা এড়িয়ে এঁকেবেঁকে প্রবাহিত হয়। নদীর এই সর্পিল গতিপথকে নদী বাঁক বা মিয়েন্ডার বলে। বাঁকের যে দিকে জলস্রোত আঘাত করে সেখানে ক্ষয় হয় (খাড়া পাড়) এবং বিপরীত দিকে পলি সঞ্চিত হয়ে ঢালু পাড় গঠিত হয়।
৩) অশ্বক্ষুরাকৃতি হ্রদ (Ox-bow Lake): নদী বাঁক খুব বেশি হলে, বাঁকের দুটি মুখ খুব কাছাকাছি চলে আসে। বন্যার সময় নদী সোজা পথে প্রবাহিত হলে বাঁকানো অংশটি মূল নদী থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে অশ্বের ক্ষুরের মতো হ্রদ সৃষ্টি করে, একে অশ্বক্ষুরাকৃতি হ্রদ বলে। গঙ্গা, পদ্মা প্রভৃতি নদীর গতিপথে এটি দেখা যায়।
৫.১.৩ বায়ুমণ্ডলের উষ্ণতার তারতম্যের তিনটি প্রধান কারণ ব্যাখ্যা করো।
উত্তর: বায়ুমণ্ডলের উষ্ণতা সর্বত্র সমান নয়, এর তারতম্যের প্রধান তিনটি কারণ নিচে আলোচনা করা হলো:
১) অক্ষাংশ (Latitude): সূর্যরশ্মির পতন কোণের ওপর উষ্ণতা নির্ভর করে। নিরক্ষরেখার ওপর সূর্যরশ্মি লম্বভাবে পড়ে, ফলে উষ্ণতা বেশি হয়। কিন্তু মেরুর দিকে অক্ষাংশ বাড়ার সাথে সাথে সূর্যরশ্মি তির্যকভাবে পড়ে এবং দীর্ঘ পথ অতিক্রম করে আসে, তাই তাপীয় ফল কম হয় এবং উষ্ণতা কমতে থাকে।
২) উচ্চতা (Altitude): সাধারণত ট্রপোস্ফিয়ারে প্রতি ১০০০ মিটার বা ১ কিমি উচ্চতা বৃদ্ধিতে ৬.৪° সেলসিয়াস হারে উষ্ণতা হ্রাস পায়। একে উষ্ণতা হ্রাসের স্বাভাবিক হার (Normal Lapse Rate) বলে। এই কারণেই একই অক্ষাংশে অবস্থিত হওয়া সত্ত্বেও সমভূমির তুলনায় পার্বত্য অঞ্চল (যেমন- দিল্লি ও সিমলা) বেশি শীতল হয়।
৩) সমুদ্র থেকে দূরত্ব (Distance from Sea): জলভাগ স্থলভাগের তুলনায় দেরিতে গরম ও দেরিতে ঠান্ডা হয়। সমুদ্র নিকটবর্তী স্থানে সমুদ্রবায়ু ও স্থলবায়ুর প্রভাবে জলবায়ু সমভাবাপন্ন হয় (নাতিশীতোষ্ণ)। কিন্তু সমুদ্র থেকে দূরে অবস্থিত স্থানগুলিতে চরমভাবাপন্ন জলবায়ু দেখা যায়, অর্থাৎ গ্রীষ্মকালে খুব গরম ও শীতকালে খুব ঠান্ডা থাকে (যেমন- মুম্বাই ও দিল্লি)।
৫.১.৪ সমুদ্রস্রোত সৃষ্টির কারণগুলি আলোচনা করো।
উত্তর: সমুদ্রস্রোত সৃষ্টির প্রধান কারণগুলি হলো:
১) নিয়ত বায়ুপ্রবাহ: এটি সমুদ্রস্রোত সৃষ্টির প্রধান কারণ। আয়ন বায়ু, পশ্চিমা বায়ু ও মেরু বায়ু সমুদ্রের ওপর দিয়ে প্রবাহিত হওয়ার সময় ঘর্ষণের ফলে জলরাশিকে নির্দিষ্ট দিকে প্রবাহিত করে। যেমন- আয়ন বায়ুর প্রভাবে নিরক্ষীয় স্রোত পূর্ব থেকে পশ্চিমে প্রবাহিত হয়।
২) পৃথিবীর আবর্তন গতি: পৃথিবীর আবর্তনের ফলে সৃষ্ট কোরিওলিস বলের প্রভাবে সমুদ্রস্রোত সোজাপথে প্রবাহিত না হয়ে উত্তর গোলার্ধে ডানদিকে এবং দক্ষিণ গোলার্ধে বামদিকে বেঁকে যায় (ফেরেলের সূত্র)।
৩) সমুদ্রজলের উষ্ণতার পার্থক্য: নিরক্ষীয় অঞ্চলে উষ্ণতা বেশি হওয়ায় জল হালকা ও প্রসারিত হয়ে বহিঃস্রোত রূপে মেরু অঞ্চলের দিকে প্রবাহিত হয়। আবার মেরু অঞ্চলের শীতল ও ভারী জল অন্তঃস্রোত রূপে নিরক্ষীয় অঞ্চলের দিকে প্রবাহিত হয়।
৪) লবণাক্ততার পার্থক্য: লবণাক্ততা বাড়লে সমুদ্রজলের ঘনত্ব বাড়ে এবং জল ভারী হয়ে নিচে নেমে যায়। কম লবণাক্ত জল হালকা বলে ওপরে থাকে এবং প্রবাহিত হয়। এই ঘনত্বের পার্থক্যের সামঞ্জস্য বিধানের জন্য স্রোতের সৃষ্টি হয়।
৫.২ যেকোনো দুটি প্রশ্নের উত্তর দাও (৫ x ২ = ১০)
৫.২.১ ভারতের পূর্ব ও পশ্চিম উপকূলীয় সমভূমির ভূ-প্রাকৃতিক পার্থক্য লেখো।
উত্তর: ভারতের পূর্ব ও পশ্চিম উপকূলের প্রধান পার্থক্যগুলি হলো:
১) বিস্তার ও প্রস্থ: পূর্ব উপকূলীয় সমভূমি বঙ্গোপসাগর ও পূর্বঘাট পর্বতের মাঝে অবস্থিত এবং এটি বেশ চওড়া (গড় ৮০-১০০ কিমি)। অন্যদিকে, পশ্চিম উপকূলীয় সমভূমি আরব সাগর ও পশ্চিমঘাট পর্বতের মাঝে অবস্থিত এবং এটি বেশ সংকীর্ণ (গড় ১০-৬৫ কিমি)।
২) বদ্বীপ: পূর্ব উপকূলের নদীগুলির (মহানদী, গোদাবরী, কৃষ্ণা, কাবেরী) মোহনায় বিশাল বদ্বীপ গড়ে উঠেছে। কিন্তু পশ্চিম উপকূলের নদীগুলি খরস্রোতা এবং মোহনা গভীর হওয়ায় কোনো বদ্বীপ গড়ে ওঠেনি।
৩) ভগ্নতা ও বন্দর: পূর্ব উপকূল খুব একটা ভগ্ন নয়, তাই এখানে স্বাভাবিক পোতাশ্রয় বা বন্দরের সংখ্যা কম। কিন্তু পশ্চিম উপকূল খুব ভগ্ন বা দন্তুর হওয়ায় এখানে মুম্বাই, কোচিন, কান্ডালা প্রভৃতি অনেক স্বাভাবিক পোতাশ্রয়যুক্ত বন্দর গড়ে উঠেছে।
৪) বালিয়াড়ি ও হ্রদ: পূর্ব উপকূলে বালিয়াড়ি দেখা যায় এবং চিল্কা, কোলেরু, পুলিকট প্রভৃতি উপহ্রদ বা লেগুন আছে। পশ্চিম উপকূলে কয়াল (যেমন- ভেম্বনাদ) বা ব্যাকওয়াটার দেখা যায়, যা স্থানীয় ভাষায় 'কয়াল' নামে পরিচিত।
৫.২.২ ভারতের জলবায়ু নিয়ন্ত্রণে প্রধান কারণগুলি ব্যাখ্যা করো।
উত্তর: ভারতের জলবায়ু বৈচিত্র্যময় এবং এটি মূলত ক্রান্তীয় মৌসুমি প্রকৃতির। এর নিয়ন্ত্রকগুলি হলো:
১) অক্ষাংশগত অবস্থান: কর্কটক্রান্তি রেখা ভারতের মাঝখান দিয়ে গেছে। ফলে দক্ষিণ ভারত উষ্ণ মণ্ডলে এবং উত্তর ভারত উপক্রান্তীয় মণ্ডলে অবস্থিত। এর ফলে দক্ষিণ ভারতে সারা বছর উষ্ণতা বেশি থাকে।
২) হিমালয় পর্বতের অবস্থান: উত্তরে হিমালয় পর্বত থাকার ফলে মধ্য এশিয়ার কনকনে ঠান্ডা বাতাস ভারতে প্রবেশ করতে পারে না, তাই শীতকাল খুব তীব্র হয় না। আবার জলীয় বাষ্পপূর্ণ দক্ষিণ-পশ্চিম মৌসুমি বায়ু হিমালয়ে বাধা পেয়ে ভারতে প্রচুর বৃষ্টিপাত ঘটায়।
৩) মৌসুমি বায়ু: ভারতের জলবায়ুর ওপর মৌসুমি বায়ুর প্রভাব সর্বাধিক। এই বায়ুর আগমনে বর্ষাকাল শুরু হয় এবং প্রত্যাগমনে শীতকাল। বৃষ্টিপাতের বণ্টন ও ঋতু পরিবর্তন মূলত এর ওপরই নির্ভরশীল।
৪) সমুদ্র থেকে দূরত্ব: ভারতের তিন দিকে সমুদ্র থাকায় উপকূলবর্তী অঞ্চলে সমভাবাপন্ন জলবায়ু বিরাজ করে। কিন্তু সমুদ্র থেকে দূরে অবস্থিত উত্তর ও মধ্য ভারতে চরমভাবাপন্ন জলবায়ু (গরম গ্রীষ্ম ও ঠান্ডা শীত) দেখা যায়।
৫.২.৩ ভারতে চা চাষের অনুকূল ভৌগোলিক পরিবেশের বিবরণ দাও।
উত্তর: চা একপ্রকার বাগিচা ফসল। এর চাষের জন্য নিম্নলিখিত পরিবেশ প্রয়োজন:
ক) প্রাকৃতিক পরিবেশ:
১) জলবায়ু: চা চাষের জন্য উষ্ণ ও আর্দ্র জলবায়ু প্রয়োজন। ২০°-৩০° সে. উষ্ণতা এবং ১৫০-২০০ সেমি বৃষ্টিপাত আদর্শ।
২) মৃত্তিকা: লৌহমিশ্রিত, হিউমাসযুক্ত উর্বর দোআঁশ মাটি চা চাষের পক্ষে শ্রেষ্ঠ। মাটি আম্লিক হওয়া প্রয়োজন।
৩) ভূমির প্রকৃতি: চা গাছের গোড়ায় জল জমলে গাছ মরে যায়, তাই পাহাড়ের ঢালু জমিতে চা চাষ ভালো হয়। এই কারণে দার্জিলিং ও অসমে ধাপ কেটে চা চাষ হয়।
খ) অর্থনৈতিক পরিবেশ:
১) শ্রমিক: চা পাতা তোলার জন্য প্রচুর সুলভ ও দক্ষ শ্রমিকের প্রয়োজন হয়। বিশেষ করে মহিলাদের আঙুল নরম হওয়ায় তারা পাতা তোলায় পারদর্শী।
২) মূলধন ও পরিবহন: বাগিচা রক্ষণাবেক্ষণ, সার, কীটনাশক ও কারখানা তৈরির জন্য প্রচুর মূলধন লাগে। বাগান থেকে কারখানায় পাতা দ্রুত নিয়ে যাওয়ার জন্য উন্নত পরিবহন ব্যবস্থা থাকা দরকার।
৫.২.৪ পূর্ব ভারতে লৌহ-ইস্পাত শিল্পের কেন্দ্রীভবনের কারণগুলি ব্যাখ্যা করো।
উত্তর: পূর্ব ভারতে (ঝাড়খণ্ড, পশ্চিমবঙ্গ, ওড়িশা) দুর্গাপুর, জামশেদপুর, রৌরকেল্লা, বোকারো প্রভৃতি স্থানে লৌহ-ইস্পাত শিল্প গড়ে ওঠার কারণগুলি হলো:
১) কাঁচামালের সহজলভ্যতা: এই শিল্পের প্রধান কাঁচামাল আকরিক লোহা ওড়িশার ময়ূরভঞ্জ, কেওনঝড় এবং ঝাড়খণ্ডের সিংভূম, নোয়ামুণ্ডি থেকে সহজেই পাওয়া যায়।
২) কয়লার প্রাচুর্য: ইস্পাত গলানোর জন্য প্রচুর শক্তির প্রয়োজন। রানিগঞ্জ, ঝরিয়া, বোকারো, গিরিডি কয়লাখনি অঞ্চল কাছেই অবস্থিত হওয়ায় উন্নত মানের কয়লা পাওয়া যায়।
৩) অন্যান্য খনিজ: চুনাপাথর, ডলোমাইট ও ম্যাঙ্গানিজ ওড়িশার গাংপুর ও বীরমিত্রপুর থেকে পাওয়া যায়।
৪) জল ও বিদ্যুৎ: দামোদর, সুবর্ণরেখা, মহানদী ও ব্রাহ্মণী নদী থেকে পর্যাপ্ত জল এবং ডিভিসি (DVC) ও এনটিপিসি (NTPC) থেকে সুলভ জলবিদ্যুৎ ও তাপবিদ্যুৎ পাওয়া যায়।
৫) পরিবহন ও বন্দর: পূর্ব ও দক্ষিণ-পূর্ব রেলপথের মাধ্যমে উন্নত যোগাযোগ ব্যবস্থা এবং কলকাতা, হলদিয়া ও পারাদ্বীপ বন্দরের নৈকট্য পণ্য আমদানি-রপ্তানিতে সুবিধা করে দিয়েছে।